অ্যালগরিদম: যার মাধ্যমে চলছে পুরো বিশ্বের প্রযুক্তি

একুশ শতক হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি, নতুন ট্রেন্ড তৈরি করা হচ্ছে যেগুলো এত দ্রুত আমাদের মাঝে জুড়ে যাচ্ছে যে আমরা সবগুলোকে নজরে রাখতেও পারছি না। কোন বিষয়টি ইতিবাচক, কোনটি নেতিবাচক এসব বিবেচনা করতেই আরেকটি বিষয়কে তুলে ধরা হচ্ছে আমাদের সামনে।

আজ আমরা চারপাশের জগত ছেড়ে এমন এক জগতকে নিজেদের করে নিচ্ছি, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। অস্তিত্বহীন এই জগত পরিচালনা করার মূলে রয়েছে অ্যালগরিদম। অ্যালগরিদম শব্দটির অর্থ নির্দেশনা। লক্ষ-কোটি লাইনের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে আমাদের জীবন। আপনাকে, আমাকে তারা পড়ছে, জানছে। তাদের কাছে আমরা নিজেদের উন্মুক্ত করে দিচ্ছি। আমাদের সকল দুর্বল দিক, পছন্দের দিক তাদের জানা। অর্থাৎ তারা চাইলেই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালনা করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার কথাই তুলে ধরা যাক। এটি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আজকাল প্রায় সব বয়সের মানুষকেই ফেসবুকে দেখা যায়। এছাড়া ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম তো আছেই। এ দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, তার সাথে ব্যবহারকারীও। বাড়ছে সেই সাথে বিশৃঙ্খলা, একে অপরের প্রতি তৈরি হচ্ছে বিরূপ মনোভাব; মানুষ বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, অযাচিত কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে, ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, ঝরে যাচ্ছে অনেকের প্রাণও।
কেন? সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক রয়েছে অনেক, এবং এই দিকগুলোকে পরিচালিত করা হচ্ছে।

এই দিকগুলো যারা তৈরি করেছে বা পরিচালনা করছে তারা কিন্তু নেতিবাচক হিসেবে তৈরি করেননি। কিন্তু এর প্রভাব যেন সকল বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। অজান্তেই আমরা পা বাড়াচ্ছি অন্ধকার দিকে। অন্ধকার থেকে সরিয়ে আনতেও তৈরি করা হচ্ছে আরও অনেক অ্যালগরিদম। অর্থাৎ এই ভার্চুয়াল জগত নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও আর নেই আমাদের। অ্যালগরিদমের সাহায্যে কীভাবে পুরো দুনিয়া বদলে যাচ্ছে তারই গল্প শোনানো হবে আজ!

অ্যালগরিদম – সংজ্ঞা ও ইতিহাস

শুরুতে বলা হয়েছে, অ্যালগরিদম শব্দটির অর্থ নির্দেশনা। শব্দটি দেখলে আমরা জটিল মনে করে চোখ ফিরিয়ে নেই, মনে করি শুধু গণিত আর বিজ্ঞানেই এর ব্যবহার। কিন্তু আসলে অ্যালগরিদম আমরা ব্যবহার করছি সবসময়ই। কোনো কাজ সমাধান করার যে ধাপ বা নির্দেশনা সেগুলোই হচ্ছে অ্যালগরিদম। নিচের অ্যালগরিদমটি দেখলেই মোটামুটি একটি ধারণা আসবে।
আমরা মনে করি আধুনিক পৃথিবীতেই অ্যালগরিদম ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু অ্যালগরিদমের ব্যবহার চলে আসছে সহাস্রব্দ ধরে। গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারেজমি অ্যালগরিদম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন নবম শতাব্দীতে। তিনি হিন্দি-আরবীয় সংখ্যার উপর একটি বই লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় রুপান্তর করা হয়। এরপর ল্যাটিন শব্দ algoritmi থেকে আসে Algorithm

ঐতিহাসিক রেকর্ড ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী প্রথম অ্যালগরিদমের ব্যবহার করেন ব্যবিলনীয়রা। তারা অ্যালগরিদমের সাহায্যে স্কয়ার রুটের মান ও খুব সাধারম হিসেব করতো। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউক্লিড তার ‘Euclidean Algorithm’ উদ্ভাবন করেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলামি বিশ্ব আরও জটিল ক্রিপ্ট্যালাইসিস, এনক্রিপশন এবং সাইফারের (সংকেত লেখনী) অ্যালগরিদম নিয়ে কাজ করে।

তবে বর্তমানের আধুনিক অ্যালগরিদমের উৎপত্তি হয় শিল্প বিপ্লবের মাঝ থেকে শেষের দিকে। তখন জর্জ বুলি বাইনারি বীজগণিত আবিষ্কার করেন যা আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি। এরপর অ্যাডা লাভলেস ১৮৪০ সালে প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেন যার মাধ্যমে অ্যালগরিদম প্রবেশ করে আধুনিক জগতে। তবে প্রথম যে মানুষটি অ্যালগরিদমকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যান তিনি অ্যালান টুরিং। এরপর অলনজো চার্চের ল্যামডা ক্যালকুলাস সংযোজন আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের পথ খুলে দেয়।

অ্যালগরিদম মূলত এক ধরনের প্রোসিডিউর, কিভাবে ধাপে ধাপে একটি কাজ সম্পুর্ণ করা যায়? প্রোগ্রামিং এর ভাষায়, বিভিন্ন বিশেষ বিশেষ সমস্যার সমাধানের জন্য লিখা প্রোসেস গুলি কে অ্যালগরিদম বলা হয় ।।এটাকে আহামরি ভাবে বিশ্লেষণ করার মতো কিছু নেই ।। তবে যে কোনো ভালো প্রোবলেম সলভার / সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার /কন্টেস্ট প্রোগ্রামার কোনো প্রোবলেম সমাধানের ক্ষেত্রে সেটা কিভাবে সলভ করবে, কি উপায়ে কোড লিখবে এটা সুন্দর ভাবে সাজিয়ে নেয়, এটাই অ্যালগরিদম ।

প্রযুক্তিতে অ্যালগরিদমের ব্যবহারঃ

শুরুতেই বলা হয়েছে, যারা প্রথমে অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন তারা কখনোই নেতিবাচক দিক মাথায় রাখেননি, তারা ভাবেননি যে তাদের তৈরি অ্যালগরিদম পৃথিবীতে এতটা প্রভাব ফেলবে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অ্যালগরিদম আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। তাই এবার বলা হবে কিছু অ্যালগরিদমের গল্প, যেগুলো প্রযুক্তি দুনিয়ার চালিকাশক্তি।

অনেক অ্যালগরিদম মধ্যে এই দশটি ক্যটাগরির অ্যালগরিদম বেশী জনপ্রিয়–

গুগল পেজ র‍্যাঙ্ক অ্যালগরিদম (Page Rank)

আজকাল আমাদের যেকোনো কিছু জানার প্রয়োজন হলে আমরা তা গুগল করি। লক্ষ লক্ষ ফলাফল থেকে বেছে গুগল এনে দেয় আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলটি, যা বের করতে তার সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে। এটি সম্ভব হয়েছে অ্যালগরিদমের জন্যই।

ইন্টারনেটের উত্থানের ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল সব ডেটাবেজ, আর তাতে রয়েছে কোটি কোটি তথ্য। এই ডেটাবেজগুলো ছড়িয়ে রয়েছে পুরো বিশ্বে। আর এই ডেটাবেজগুলো থেকে তথ্য খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজন সার্চ ইঞ্জিনের

গুগল তাদের পেজ র‍্যাঙ্ক অ্যালগরিদমের সাহায্যে মুহূর্তেই আমাদের ফলাফল এনে দিলেও এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে গুগলকে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন ওয়েবপেজগুলোকে সূচি এবং র‍্যাংকিংয়ে নিয়ে আসতে প্রথম এই অ্যালগরিদমের উদ্ভাবন করেন, যা পরবর্তীতে তাদের নতুন গুগল সার্চ ইঞ্জিনে ব্যবহার হয়।
এই অ্যালগরিদমের সাহায্যে গুগল বিবেচনা করে কোন পেজগুলো বেশি নির্ভরযোগ্য, যদি একটি সাইটে এমন নির্ভরযোগ্য পেজ বেশি থাকে তাহলে গুগল সেটিকে একটি স্কোর প্রদান করে র‍্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে রাখে।

শুরুতে পেজ র‍্যাঙ্ক অ্যালগরিদম প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে, বর্তমানে এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পেজ র‍্যাঙ্ককে নিয়ে একটি গোটা ইন্ডাস্ট্রির সৃষ্টি হয়েছে, যাকে বলে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন বা SEO। এই অ্যালগরিদমের ফলেই আজ গুগল সার্চ ইঞ্জিন শীর্ষে এবং এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে প্রতিষ্ঠার মাত্র আট বছরের মাথায় Google শব্দটি ক্রিয়াপদে পরিণত হয়। পেজ র‍্যাঙ্ক বর্তমানে গুগলের ২০০টি ওয়েবসাইট পরিমাপকের মধ্যে একটি হলেও সার্চ ইঞ্জিনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এটিই।
ফেসবুকের অ্যালগরিদম

ফেসবুকের এলগরিদমকে বলা হয়ে থাকে এডজ রেঙ্ক (Edge Rank). এই এলগরিদম মুলত তিনটা বিষয়ের উপর কাজ করে থাকে। Affinity, Weight এবং Time decay।

Affinity: এটা মুলত আপনার পোস্টের এংগেইজমেন্ট বিহেভিয়ার। আপনার পোস্টে কি পরিমান এংগেইজমেন্ট হয়। কারা করে, কারা করে না। কত ভাগ করে এবং কত ভাগ করে না। যারা এংগেইজড হয় তারা কি করে? লাইক, শেয়ার, কমেন্ট? এই ডাটা গুলোর উপর ভিত্ত করেই আপনার পোস্ট কতজনের নিউজফিডে শো হবে তা নির্ভর করে থাকে।

Weight / Type of Content: এটা মুলত আপনার পোস্টের ধরন। আপনি কি ধরনের কন্টেন্ট তৈরি করছেন অথবা শেয়ার করছেন? টেক্সট, ছবি, ভিডিও? ফেসবুক এক এক ধরনের পোস্টকে এক এক ভাবে ট্রিট করে। যেমন বর্তমান সময়ে ভিডিও এবং ছবি নিউজফিডে বেশি শো হয়ে থাকে। আবার মোবাইল থেকে ভিজিট করলে ভিডিও বেশি শো হয়।

Time Decay: এইটা মুলত আপনার পোস্টটি কতটুকু পুরানো তার উপর নির্ভর করে। ফেসবুক মুলত মোস্ট রিসেন্ট পোস্টগুলো নিউজ ফিডে বেশি দেখায়। তাই আপনার পোস্ট মুলত যত পুরানো হতে থাকবে, আপনার রিচ তত কমতে থাকবে। তবে নিয়মিত ভাবে এংগেইজমেন্ট পেলে রিচ বেড়ে যাবে।

এনক্রিপশন ব্যবস্থায় অ্যালগরিদম

আমরা প্রতিদিন অনলাইনে অসংখ্য তথ্য শেয়ার করি। এর মাঝে রয়েছে অসংখ্য সাইটের পাসওয়ার্ড, মোবাইল নাম্বার, ইমেইল, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ বা কল ইত্যাদি। এগুলো সম্পন্ন হয় ইন্টারনেট অর্থাৎ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। পুরনো দিনের ডাবল লাইন টেলিফোনের মতো যদি কেউ আপনার মেসেজ বা কলগুলো আরেকটি ডিভাইসের মাধ্যমে পড়তে পারে তাহলে আপনার কেমন মনে হবে? আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না এমনটা হোক।

এখানেই আসে এনক্রিপশন ব্যবস্থা। আপনার তথ্যগুলোকে অ্যালগরিদমের সাহায্যে সাংকেতিক ভাষায় রূপান্তর করা হয় যা নেটওয়ার্ক দিয়ে আরেকটি ডিভাইসে পৌঁছায়। এর ফলে মাঝপথে কেউ এই তথ্য খুঁজে পেলেও তার অর্থ কোনোদিনই খুঁজে পাবে না। বেশিরভাগ প্রোগ্রামের এনক্রিপশন অ্যালগরিদম ঘন ঘন পরিবর্তন করা হয় যাতে কেউ বুঝতে না পারে। জটিল গাণিতিক ব্যবস্থা দিয়ে এসব অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়।

২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী WannaCry র‍্যানসমওয়্যারের আক্রমণে প্রায় ৩ লাখ কম্পিউটার সংক্রমিত হয়, অন্যান্য র‍্যানসমওয়্যারের মতোই এটি শক্তিশালী অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সংক্রমিত কম্পিউটারগুলোর সকল ডাটাকে এনক্রিপ্ট করে ফেলে এবং ডিক্রিপ্ট করার জন্য ৬০০ ডলার পর্যন্ত দাবি করে। উল্লেখ্য, কেউ যদি ডিক্রিপশন টুল না তৈরি করে তাহলে র‍্যানসমওয়্যার কর্তৃক আক্রান্ত তথ্য আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

ত্রুটি সংশোধন অ্যালগরিদম

ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলোতে তথ্যাদি রাখার জন্য বিভিন্ন প্রকার স্টোরেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মাঝে সবচেয়ে পরিচিত হচ্ছে হার্ডড্রাইভ। একটি হার্ড ড্রাইভে এমন অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয় যাতে ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও এর ভেতরের তথ্য পড়া যায়। প্রতিনিয়ত হার্ড ড্রাইভ ব্যবহারের ফলে এতে ব্যাড সেক্টর তৈরি হয় এবং সেগুলোতে আর তথ্য রাখা সম্ভব হয় না। সেখানে যদি আগে থেকেই কোনো তথ্য থেকে থাকে তাহলে অ্যালগরিদম সেগুলোকে আরেকটি ভালো সেক্টরে নিয়ে যাবে। এভাবে কোনো হার্ডড্রাইভের লাইফস্প্যান ৫০% কমে গেলেও আমরা সেগুলোকে ব্যবহার করতে পারি।

শুধু হার্ড ড্রাইভই নয়, প্রতিটি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস যেখানে তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে সেখানে Error Correction Algorithm বা ত্রুটি সংশোধন অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়।

ডেটা কম্প্রেশন (Data Compression)

যতই দিন যাচ্ছে বৃদ্ধি পাচ্ছে তথ্য ও উপাত্তের পরিমাণ। এই বিপুল পরিমাণ তথ্যকে রাখার জন্য প্রয়োজন বিশাল সব ডেটা সেন্টার। কিন্তু একটি ডেটা সেন্টার তৈরি করা অনেক ব্যয়বহুল। এজন্য ডেটা কম্প্রেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ইদানীং আমরাও ডেটা কম্প্রেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তন্মধ্যে ZIP ফাইল কম্প্রেশন অনেক জনপ্রিয়। এছাড়া আমরা যখন কোনো ভিডিও রেকর্ড করি, এর আকার তুলনামূলকভাবে অনেক বড় হয় এবং বেশি জায়গা দখল করে। এনকোডিংয়ের মাধ্যমে এসবের আকার কমিয়ে আনা হয়। কম্প্রেশনের ধারণা পরিস্কার করার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক।
“ABBCABBCABACABACABACDDDBDB”-তে ২৬টি অক্ষর রয়েছে। একে যদি ABBC2ABAC3D2DB2 এভাবে লেখা হয় তবে শুধু ১৫টি অক্ষরেই লেখা সম্ভব হয় যা আগের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। তাহলে ভাবুন গিগাবাইট বা তার চেয়েও বড় সাইজের তথ্যকে কম্প্রেস করলে তার আকার কতটা কমানো সম্ভব।

অ্যালগরিদমের ভয়াবহতা

শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আজ আমাদের জীবনকে বন্দী করে রেখেছে। আমরা বাস্তব জগতের চেয়ে কাল্পনিক এই জগতকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, গুগল এসব অনলাইন প্লাটফর্ম আমরা বছরের পর বছর ব্যবহার করছি। প্রতিনিয়ত তাদের মাধ্যমে আমাদের মনোভাব শেয়ার করছি, যদি ইউটিউব বা ফেসবুক ভিডিওতে আপনি ফুটবল সম্পর্কিত দুটি ভিডিও দেখেন তাহলে দেখবেন পরেরবার ফুটবল দিয়েই আপনার টাইমলাইন ভর্তি হয়ে গিয়েছে, আপনি ফেসবুকে স্ক্রল করলে সেগুলোই দেখতে পারবেন যেগুলো আপনার খুব পছন্দ কিংবা খুব অপছন্দের।

আপনি এই অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে যেটিই করেন তা সার্বক্ষণিক মনিটর করা হয়। আপনি কোন ছবিতে এসে থামলেন, কতক্ষণ সেটি দেখলেন, তারা জানে যখন আপনি একাকী ও বিষণ্ণ থাকেন, তারা জানে যখন আপনি আপনার পছন্দের মানুষের ছবিটি দেখছেন, তারা জানে আপনি ইন্ট্রোভার্ট না এক্সট্রোভার্ট। তারা জানে আপনার পুরোটাই। আর এই তথ্যগুলো যে সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করছে বা যারা নিয়ন্ত্রণ করছে তারা কিন্তু কোনো মানুষ নয়। এগুলো সব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে অ্যালগরিদমের দ্বারা। এই অ্যালগরিদমগুলো আপনার-আমার ভবিষ্যদ্বাণী তৈরি করতে সক্ষম।

গুগল, ফেসবুক, টুইটার কিন্তু বিলিয়ন ডলার টেক ইন্ডাস্ট্রি। তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা করা, প্রতিবছর আগের তুলনায় বেশি মানুষ যেন তাদের সেবা গ্রহণ করে এটিই তাদের লক্ষ্য। মানুষকে ধরে রাখতে এবং আকৃষ্ট করতে তারা নিত্যনতুন ফিচার নিয়ে আসে, আপনি যতটা সময় তাদের প্লাটফর্মে ব্যয় করবেন ততটাই তাদের লাভ। নতুন এসব প্রযুক্তি যেমন আমাদের সময় বাঁচিয়ে এনেছে অনেকখানি, তেমনই সময় অপচয়েরও নানা পন্থা বের করেছে।

মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া ডিসঅর্ডার, স্ন্যাপচ্যাট ডিসমোরফিয়ার (ফিল্টার দেয়া সেলফির মতো দেখতে প্লাস্টিক সার্জারি করানো) মতো রোগ তৈরি হচ্ছে, গুজব ছড়ানো সম্ভব হচ্ছে অতিসহজেই। আর এজন্য মানুষের মৃত্যুও ঘটছে, কমেন্ট করা থেকে তৈরি হচ্ছে সহিংসতা। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল মিথ্যা সংবাদ ও ক্লিকবেইটের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করছে এবং না জেনেই সৃষ্টি হচ্ছে গুজব ও বিশৃঙ্খলার।

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বিশাল অংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। নিজেদের জনপ্রিয় করে তুলতে অশ্লীল ও অনৈতিক নানা অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে তারা। আমাদের দেশে তাকালেই অসংখ্য ঘটনা দেখা যাবে যেগুলো তৈরি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। ইন্সটাগ্রামে আজকাল অশ্লীলতার ছড়াছড়ি, কম বয়সী ছেলেমেয়েরা দ্রুতই এসব কর্মকাণ্ডে আসক্ত হচ্ছে, যার ফলে তাদের ভবিষ্যৎ শঙ্কায় পরিণত হচ্ছে। বিষণ্ণতা, রাগ, অপকর্ম মিলিয়ে দিনে দিনে আমরা ধাবিত হচ্ছি অন্ধকার এক প্রজন্মের দিকে।অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর মূল আয়ের উৎস তৈরি হয় বিজ্ঞাপন এবং মানুষকে বিভিন্ন দিকে চালিত করার মাধ্যমে। আপনি একটি বই পড়ছেন, তখন আপনার পোস্টে একটি কমেন্টের নোটিফিকেশন আসলো। আপনি সেটি দেখতে গিয়ে আরও কয়েকটি কমেন্ট পড়লেন, একটু স্ক্রল করতেই একটি ফানি ভিডিও চোখে পড়লো, আপনি রিয়্যাক্ট করলেন ও এর মাঝে কয়েকটি বিজ্ঞাপনও দেখে ফেললেন। এভাবে আপনি আপনার মূল্যবান সময় এমন কিছুর উপর ব্যয় করলেন যেগুলো আপনার কোনো কাজেই আসবে না।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই অ্যালগরিদমগুলো যদি খারাপ উদ্দেশ্যে না তৈরি হয় তাহলে এমনটি হচ্ছে কেন? উত্তর বিশ্লেষণ করা কঠিন, কিন্তু আমরা চাইলেই এই অ্যালগরিদমগুলোর সাহায্যে আমাদের জীবনকে বিপথে না গিয়ে আরও সহজ করে তুলতে পারি।তথ্যনির্ভর বিভিন্ন জানার উৎসকে আমরা টাইমলাইনে এগিয়ে রাখতে পারি,যেগুলো আমাদের সময়ের অপচয় করে সেগুলোকে সরিয়ে ফেলতে পারি.কাজের সময় Do Not Disturb Mode ব্যবহার করতে পারি

আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে কোন সাইটগুলো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে এবং শুধুমাত্র সেসবের সাথে যুক্ত হতে হবে। আর হ্যাঁ, সবসময় চাইলেই কোনো পোস্ট বা নিউজে রিয়্যাক্ট করা যাবে না। ভুল তথ্যে পড়া আপনার কোনো রিয়্যাক্ট সেই পোস্টকে আরও মানুষের কাছে নিয়ে যাবে।

সর্বোপরি আপনি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরে এসে বাইরের মানুষের সাথে মিশুন, আড্ডা দিন, ঘুরুন, বই পড়ুন। এগুলো আপনার মনকে উপভোগ্য করে তুলবে। প্রতিটি মুহূর্তকে মনের মাঝে রাখার চেষ্টা করুন, সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারও বন্ধুর মাঝেও আপনার মন বিষণ্ণ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের বন্ধুরা সেকেন্ডেই সেই বিষণ্নতা কাটিয়ে দিতে পারে।তথ্য সুত্রঃ ইন্টারনেট

Leave a Comment