সে কি ঝগড়া আমাদের তিন জনের মাঝে!

একজন লিথুানিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, একজন পর্তুগালের আর আমি এস্তনিয়ার।এক পর্তুগীজ ছাত্র আজ তার ব্যাচেলর থিসিস ডিফেন্স করেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি-

-তুমি যে পদ্ধতি’তে ডাটা কালেক্ট করেছ; এর বাইরে আর কোন পদ্ধতি’তে কালেক্ট করা যেত?

ছেলেটা এরপর এমন উত্তর দিয়েছে- আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে সে কিছু’ই জানে না!

আমি নিজে রিসার্চ ম্যাথড কিংবা গবেষণা পদ্ধতি সাবজেক্ট পড়াই। ছেলেটা থিসিস করেছে- পর্তুগালের একটা শহরের ক্রিয়েটিভ বিজনেস ইন্ডাস্ট্রিজ নিয়ে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে- এই ইন্ডাস্ট্রি’র ওভারভিউ তুলে ধরা। এমনিতে’ই টপিক’টা আমার কাছে ব্যাচেলরের ছাত্রের জন্য ঠিক মনে হয়নি। যা হোক, আমি বৈজ্ঞানিক আলোচনায় যাচ্ছি না। কারন আমার এই লেখা সব রকম পাঠকের জন্য।

তো, খুব স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেটা সেকেন্ডারি ডাটা সোর্স নিয়ে কাজ করেছে। আমি বুঝবার জন্য তাকে জিজ্ঞেস করেছি

-আর কোন পদ্ধতি’তে তুমি ডাটা কালেক্ট করতে পারতে?

এইবার সে বলেছে ইন্টার্ভিউ করতে পারতাম! শুনে আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না- এটা কি করে সম্ভব! ইন্টার্ভিউ করে কিভাবে একটা শহরের ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি’র ওভারভিউ তুলে ধরা সম্ভব! কয়জনের ইন্টার্ভিউ করবে সে? এরপর মনে হলো হয়ত “কী-ইনফরমেন্ট” ইন্টার্ভিউ করলে যদি কিছু করা যায়। তাই তাকে জিজ্ঞেস করলাম

– কোন ধরনের ইন্টার্ভিউ করলে এমন ডাটা কালেক্ট করা সম্ভব? ইন্টার্ভিউ তো অনেক রকম আছে।

এইবার সে বলছে- না, সার্ভে করতে হবে মনে হয়!

এরপর আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম- সে সার্ভে, ইন্টার্ভিউ, সেকেন্ডারি, প্রাইমারী সোর্স কিছু’ই আসলে ভালো করে বুঝতে পারেনি!

অথচ যেই পদ্ধতি’তে সে ডাটা কালেক্ট করেছে, সেটাই সঠিক পদ্ধতি ছিল। স্রেফ সে নিজের পক্ষে যুক্তি দিলেই পারত।

তো, ওর ডিফেন্স শেষে গ্রেড দিতে হবে। আমরা তিন দেশের তিন শিক্ষক এইবার নিজেদের মতামত জানাচ্ছি। এই ছেলের জন্য আমার মতামত হচ্ছে

– একে কোন ভাবেই পাশ করানো যাবে না। কারন সে বেসিক গবেষণা পদ্ধতি’ই ভালো করে জানে না। ব্যাচেলর লেভেলে এটা না শিখলে, আর কোথায় শিখবে? তাছাড়া সে একটা প্রেস্টিজিয়াস ইউরোপিয়ান ডিগ্রী অর্জন করবে। এইসব না জেনে কোন ভাবেই পাশ দেয়া যাবে না। তাই আমার দিক থেকে – শূন্য!

কিন্তু লিথুানিয়ার শিক্ষক তাকে “এক” দিয়েছে! পর্তুগালের শিক্ষকও “এক” দিয়েছে! তাদের যুক্তি হচ্ছে

-ছেলেটা ডিফেন্স পর্যন্ত চলে এসছে, তাছারা পেপারটা তো মোটামুটি হয়েছে। পাশ করিয়ে দেয়া যায় কোন ভাবে!

এখন আমি যদি “এক” না দেই, তাহলে ওরা তো কোন ভাবেই পাশ করাতে পারবে না!

শুরু হলো বিশাল তর্ক-বিতর্ক! মানে এমন কিছু নেই যা নিয়ে আমরা তর্ক বিতর্ক করিনি।

তাছাড়া পর্তুগীজ এই ছেলেটা ভালো করে ইংরেজি’ও বলতে পারে না! আমি তাকে ডিফেন্সের সময় জিজ্ঞেস করেছি

-তুমি তো ভালো করে ইংরেজি’ই বলতে পারছ না! তাহলে তুমি উত্তর দিবে কিভাবে! তাছাড়া তুমি তো অংক টাইপ কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনা করছ না। তুমি পড়াশুনো করছ ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে। এখানে তো তোমাকে কথা বলেই অন্যদেরকে বুঝাতে হবে। নইলে কিভাবে সম্ভব! তুমি কি করে এডমিশন পেলে?

ছেলেটা উত্তর দিয়েছে

-আমি তো আইইএলটিএসে ৬ পেয়েছি। এই জন্য’ই তো এডমিশন পেয়েছি!

আমার আজীবন’ই মনে হয়েছে আইইএলটিএস স্কোর দিয়ে আসলে ইংরেজির লেভেল পুরোপুরি যাচাই করা যায় না। এটা কেবল’ই একটা টেস্ট ! এটা অতি অবশ্য’ই আমার নিজের মতামত।

আমার মনে আছে প্রথমবার আমি যখন এই টেস্ট দিয়েছিলাম, পেয়েছি- ৫.৫!

আমি বরাবর’ই ইংরেজিতে ভালো ছিলাম। অন্তত আমার নিজের এমনটাই মনে হতো। তাই কোন রকম প্রস্তুতি না নিয়েই রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিতে চলে গিয়েছিলাম! আমার ধারণা ছিল পরীক্ষা দিলেই একটা স্কোর পাবো, যেটা দিয়ে ইউনিভার্সিটি গুলোতে এডমিশন-স্কলারশিপ পাওয়া যাবে! কিন্তু পেয়ে বসলাম ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ!

এমন ধাক্কা খেয়েছিলাম, বলার মতো না! কারন আমি আসলে জানতাম’ই না কোন পদ্ধতি’তে পরীক্ষা হয়। দেখা গেল লিসেনিং এ অডিও চলে গিয়েছে, আমি প্রশ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছি! এই টাইপ আরকি! কারন পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে’ই আমার কোন ধারণা ছিল না।

এরপর দুই মাস প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিলাম। পেয়েছি ৮. ৫!

তো, দুই মাসে কি আমার ইংরেজি এতো ভালো হয়ে গিয়েছে? কিংবা আবার পরীক্ষা দিলে কি আমি আদৌ এই স্কোর পেতাম?

আমার সত্যি’ই জানা নেই! আধ ঘণ্টার একটা টেস্টে কি করে এরা ইংরেজি যাচাই করছে, আমার সত্যি’ই এই নিয়ে সন্দেহ হয়।

যা হোক, পুরো পৃথিবীব্যাপী এটা প্রচলিত; তাই এই নিয়ে আমার মতামতে কি যায় আসছে!

তো ছেলেটার গ্রেড দিতে হবে। আমরা তিন দেশের তিন শিক্ষক রীতিমত ঝগড়া-ঝাটি করছি! কি করা যায়…

শেষমেশ বাকী দুইজনের কথায় রাজি হয়ে আমিও “এক” দিয়ে দিলাম। অর্থাৎ ছেলেটা পাশ করেছে।

এখন এই ছেলেটার গ্রেড দেয়া নিয়ে আমরা তিনজন যেই পরিমাণ তর্ক-বিতর্ক করেছি; সেটা যদি তিনজন বাংলাদেশি শিক্ষক করতো; আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি- এরপর এরা কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দেখত না!
অথচ রেজাল্ট দেয়ার পর যখন আমাদের পেশাগত কাজ শেষ হয়েছে, পর্তুগালের শিক্ষক আমাকে বলেছে

-আমিনুল, ভাইরাস পরিস্থিতি যদি না থাকতো; আমি তোমার জন্য এক্ষুনি একটা টিকেট পাঠাতাম। খুব ইচ্ছা করছে দুইজন মিলে কোন বারে বসে একটা সন্ধ্যা কাটাই আর তর্ক করি!

আমি হেসে বলেছি

-পাঠিয়ে দাও। আমি তো আর তোমার মতো বুড়ো না। ভাইরাস আমাকে কাবু করতে পারবে না। এক্ষুনি উড়াল দেব!

যা হোক, এরপর যে যার কাছ থেকে অন লাইন প্লাটফর্মে বিদায় নিয়েছি।
খানিক আগে পর্তুগালের ওই শিক্ষক আমাকে মেইল করেছে। মেইলে সে যা লিখেছে, সেটা বাংলা করলে দাঁড়ায়

আমিনুল,
কোয়ালিটেটিভ রিসার্চে তোমার আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব ভালো। আমার একটা মাস্টার্সের ছাত্র ইন্টার্ভিউ টেকনিক ব্যাবহার করছে ওর থিসিসের জন্য। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, এটা ওর জন্য ঠিক হচ্ছে কিনা- তুমি কি ওর সেকেন্ড সুপারভাইজার হবে?

আমি যেহেতু স্টোরি টেলিং এর উপর’ই কাজ করছি, তাছাড়া ল্যাংগুয়েজ ডিসকোর্স (এই সব আপনাদের বুঝার দরকার নেই। মানে আপনি একটা শব্দ ব্যাবহার করবেন, এর হাজার রকম মানে আমি খুঁজে বের করতে পারবো টাইপ কিছু) নিয়ে কাজ করি। তো ই-মেইলের উত্তরে আমি লিখেছি

-ঠিক আছে। তুমি আগে ওর পেপারটা আমাকে পাঠাও।

অথচ ঘণ্টা কয়েক আগে আমরা রীতিমত ঝগড়া করেছি একটা ছেলের গ্রেড নিয়ে।

আর বাংলাদেশে হলে কি হতো জানেন?

আমি তো বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি এবং পড়িয়েছি। তো, আমাদের দেশের শিক্ষকরা কি করতো জানেন?

এমন তর্ক-বিতর্ক শেষে এরা বলবে- সে তো কিছু’ই জানে না। মূর্খ! এরপর একজনের সাথে আরেকজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ!

শুধু সেটা হলেও হতো। এরপর দেখা যাবে তার কোন ছাত্র যদি থিসিস ডিফেন্স করতে যায়, তাকে ফেল করিয়ে দেবে কিংবা হয়রানি করবে! এইসব তো আমি নিজ চোখে দেখছি।

আমার এক বন্ধু, যে কিনা নিজে কোন দিন রাজনীতি করেনি। সে থিসিস করেছে যেই স্যারের অধীনে, সেই স্যার রাজনীতি করতো। মাস্টার্সে ফার্স্ট হবার পরও তাকে শিক্ষক হিসেবে নেয়া হয়নি!

কেন নেয়া হয়নি?

কারন তার থিসিসি সুপারভাইজার অন্য দলের রাজনীতি করে!
চিন্তা করে দেখুন অবস্থা! সেই ছেলে নিজে জীবনে কোন দিন রাজনীতি করেনি! অথচ তাকে কিনা এর মাশুল গুনতে হচ্ছে! কারন তার সুপারভাইজার অন্য দলের রাজনীতি করে!

বিশ্ববিদ্যালয় গুলো হবার কথা মুক্তমত চর্চার স্থান। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো?

প্রশ্ন করলেও ছাত্রদের বকা শুনতে হয়! কেউ কেউ তো আবার ফেল করিয়ে দেয়!

অনার্স করার সময় সিলেটের শাহজালাল ইউনিভার্সিটি’র এক ম্যাডাম আমাকে প্রকাশ্য-দিবালোকে সবার সামনে হুমকি দিয়ে বলেছিল

-আমি দেখে নেব, তুমি এই কোর্সে পাশ করো কিভাবে!

আমার অপরাধ কি ছিল জানেন?

আমি ম্যাডামের ক্লাসের সময় অন্য এক শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলাম এক মিটিং এ যোগ দিতে।

কেন গেলাম মিটিং এ যোগ দিতে?

কারন আমি ইংরেজি বিতর্ক করতাম। সার্ক ডিবেটে অংশ নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে আমাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। স্যার ছিল আমাদের ম্যানেজার। স্যার ওই সময় মিটিং এর জন্য যেতে বলেছিলেন। আমি ম্যাডামের কাছে অনুমতি নিয়েই গিয়েছিলাম। ম্যাডামকে বলেছিলাম

-আমার ক্লাসে আসতে একটু দেরি হবে। স্যার মিটিং এ যেতে বলেছে।
ম্যাডাম বলেছে

-ঠিক আছে সমস্যা নেই।

১৫ মিনিট পর ক্লাসে ঢুকার পর ম্যাডাম আমাকে যা তা ভাষায় কথা বলেছেন। প্রথমে শুরু করেছেন- আমার ক্লাস রেখে স্যারের সাথে মিটিং এ যাও। তোমার তো সাহস কম না! এমনকি এও বলেছেন – কই থেকে উঠে আসছ? বাপ-বা কিছু শেখায়নি ? মনে তো হয় বস্তি থেকে উঠে এসছ!

এর আগে ম্যাডাম যা যা বলেছে, আমি কোন উত্তর দেইনি। যখন এইসব বলা শুরু করেছে; আমি স্রেফ বলেছি

-ম্যাডাম আপনি কই থেকে উঠে এসছেন? এতটুকু বলতে পারি, আপনার চাইতে ভালো জায়গা থেকে উঠে এসছি। তাছাড়া বস্তি থেকে উঠে আসলেই বা সমস্যা কোথায়? বস্তির মানুষ কি পড়াশুনা করতে পারবে না? পড়াশুনা কি শুধু আপনার মতো বড়োলোকদের জন্য?

এই কথা শুনে ম্যাডাম রেগে মেগে আমাকে বলেছে

-ক্লাস থেকে এখন’ই বের হও।

আমি বলেছি

-ক্লাস করার সম্পূর্ণ অধিকার আমার আছে। আপনি আমাকে অনুমতি দিয়েছিলেন ১৫ মিনিট পরে ক্লাসে আসলে ক্ষতি নেই। আমি তো কোন অপরাধ করিনি। ইউনিভার্সিটির হয়ে ইংরেজি বিতর্ক করার মানুষ পাচ্ছিল না, তাই যেতে রাজি হয়েছি। এখানে আমার অপরাধ কোথায়?

ম্যাডাম এইবার রেগেমেগে নিজেই ক্লাস থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। যাবার আগে বলে গিয়েছেন

-আমি দেখে নেব, তুমি এই কোর্সে কিভাবে পাশ করো।

আমি ম্যাডামের ওই কোর্স শেষ করেছি যখন শিক্ষক পরিবর্তন হয়েছে!
তো ম্যাডাম আমার উপর কেন রেগে গিয়েছিলেন? আমার অন্যায়টা কি ছিল?

অনেক পরে জানতে পেরেছি- ওই স্যারের সঙ্গে ম্যাডামের ম্যাডামের সম্পর্ক খারাপ ছিল। সেই রাগ তিনি আমার উপর ঝেড়েছেন!

এই ম্যাডাম এখনও বহাল তবিয়তে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন সেখানে! জানি না এরা আসলে কি শেখায়!

এই হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক সমাজ!

Leave a Comment