নোবেল পুরষ্কার-পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ও যুগান্তকারী পুরস্কার!

ডিনামাইট আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল ৩ কোটি ১০ লাখ ক্রোনার রেখে গিয়েছিলেন, আজকের বাজারে যা প্রায় ১৮০ কোটি ক্রোনের সমান। তার রেখে যাওয়া ওই অর্থ দিয়েই ১৯০১ সাল থেকে মর্যাদাপূর্ণ এ নোবেল পুরস্কারের প্রচলন করা হয়। এতদিন এ নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার।

আলফ্রেড নোবেলের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ১৯০১ সালে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে গোড়াপত্তন ঘটে। ১৯৬৮ সালে এ তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি।

সুইডিশ-বংশোদ্ভূত উদ্ভাবক এবং আন্তর্জাতিক শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী, 1896 সালে তাঁর মৃত্যুর পরে সেটি খোলা হয় এবং সেই উইল অনুসারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান বা মেডিসিন ও সাহিত্যের নোবেল পুরষ্কার সুইডেনের স্টকহোমে পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে। পুরষ্কারটি নরওয়ের অসলোতে (Oslo, Norway ) দেওয়া হয়।

আজকের দিনে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, মেডিসিন, সাহিত্যে, শান্তি, অর্থনীতি। উল্লিখিত এইসব বিষয়ে অভূতপূর্ব অবদানের জন্য নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। যেমন অমর্থ সেন ১৯৯৮ সালে walfare economics (মানুষের স্বার্থে কাজে লাগে এমন কিছু রিসার্চ ওয়ার্ক করেছিলেন অর্থনীতি তে ) এ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন।

২০২০ সালে কৃষ্ণ গহ্বরের গবেষণায় পদার্থের নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানী।মহাবিশ্বের অন্যতম বিস্ময় কৃষ্ণ গহ্বর সম্পর্কে নতুন আবিষ্কারের গবেষণায় এ বছর পদার্থে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। মঙ্গলবার রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি সুইডেনের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে এ বছরের পদার্থে নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে।

পুরস্কার জয়ীরা হলেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানী রজার পেনরোস, মার্কিন জ্যোতির্বিদ রেইনহার্ড গেঞ্জেল ও জার্মান পদার্থবিদ আন্দ্রিয়া ঘেজ। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি বলছে, এই তিন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার মাধ্যমে কৃষ্ণ গহবর সম্পর্কে নতুন বোঝাপড়া সামনে এনেছেন।

দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি বলেছে, আপেক্ষিকতাবাদের সাধারণ তত্ত্বটি কৃষ্ণ গহ্বরের গঠনের দিকে পরিচালিত করে। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির জেনারেল সেক্রেটারি গোরান কে. হ্যানসন বলেছেন, মহাবিশ্বের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন গোপন রহস্য উন্মোচনে সহায়তা করবে পুরস্কারজয়ীদের গবেষণা।কৃষ্ণ গহ্বরের গবেষণায় পদার্থের নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানীl

এবারও চিকিৎসায় নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানী।চিকিৎসায় বিশেষ অবদানের জন্য এ বছরও নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন, মার্কিন বিজ্ঞানী হার্ভে জে আল্টার ও চার্লস এম রাইস এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল হাউটন। গত বছরও তিন বিজ্ঞানী যৌথভাবে চিকিৎসায় নোবেল পেয়েছেন।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কার এবং এর চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এ বছর দুই মার্কিন বিজ্ঞানী এবং এক ব্রিটিশ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে বাংলাদেশে সময় বিকেলে এক অনুষ্ঠানে নোবেল কমিটি এই ঘোষণা দেয়।

ইতিহাসে এই প্রথম হেপাটাইটিস সি ভাইরাস কিভাবে নিরাময় সম্ভব তা জানিয়েছেন ওই তিন বিজ্ঞানী। নোবেল বিজয়ী এই তিনজন দূরারোগ্য হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সামনে এনেছেন। তারা রক্ত ​​পরীক্ষার মাধ্যমেই এই ভাইরাস শনাক্ত এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যা লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

বিশ্বজুড়েই একটি প্রধান স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে হেপাটাইটিস সি। এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ সিরোসিস এবং যকৃতের ক্যান্সারে ভোগেন l

হেপাটাইটিস সি অনেক সময় নীরব ঘাতক হিসেবে শরীরে বাসা বাধে। প্রতি বছর প্রায় ৭ কোটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রায় ৪ লাখ মানুষ এই ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যু বরণ করছে।

যকৃতের ক্যান্সারের প্রধান কারণ এই ভাইরাস। ফলে রোগীদের বেশিরভাগ সময়ই যকৃত প্রতিস্থাপন করতে হয়। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস নিয়ে ওই তিন বিজ্ঞানীর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারকে যুগান্তকারী অর্জন বলে উল্লেখ করেছে নোবেল কমিটি।

এর আগে চিকিৎসায় নোবেলের জন্য মনোনীত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা সংক্ষিপ্ত তালিকা সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। বরাবরের মতোই সব নথিপত্র অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রেখে তা জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হয়।

অক্সিজেনের প্রাপ্যতার সঙ্গে শরীরের কোষের সাড়া দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে গত বছরও চিকিৎসা বিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন মার্কিন ও ব্রিটিশ তিন বিজ্ঞানী।ওই তিন নোবেলজয়ী হলেন- মার্কিন চিকিৎসাবিদ উইলিয়াম জি. কেইলিন জুনিয়র, গ্রেগ এল সেমেনজা ও ব্রিটিশ চিকিৎসাবিদ স্যার পিটার জে. র‌্যাটক্লিফ। অক্সিজেনের উপস্থিতি পাওয়ার পর মানবদেহের কোষ কীভাবে সাড়া দেয়; সে বিষয় নিয়ে যুগান্তকরী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তারা এই পুরস্কার পান।

এদিকে চলতি বছর মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারজয়ীদের গত বছরের তুলনায় ১০ লাখ ক্রোন বা প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ডলার বেশি দেয়া হবে বলে সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেন।

আগামী ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান, ৭ অক্টোবর বুধবার রসায়ন, ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সাহিত্য, ৯ অক্টোবর শুক্রবার শান্তি এবং ১২ অক্টোবর সোমবার অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী বা বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করবে দ্য রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স। এ ছাড়া দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি থেকে সাহিত্য এবং নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কিংবা বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পুরস্কার হলেও অনেক ব্যাক্তিগন এই স্বকৃতি গ্রহণ করতে অস্বকৃতি জানিয়েছ। তার মধ্যে ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ বিজেতা জাঁ পল সাত্রে পুরষ্কার নিতে অস্বীকার করেন। ৫৯ বছর বয়সী এই সাহিত্যিকের বক্তব্য ছিল তিনি সব সময় আনুষ্ঠানিক সম্মান গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। কারণ তিনি ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপে’ পরিচিত হয়ে উঠতে চান না। প্যারিসের বাইরে তাঁর বান্ধবী বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নাট্যকার সিমন দ্য বোভ্যেয়ার-এর ফ্ল্যাটে সাংবাদিকেরা তাঁর সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন। তিনি এও জানান যে নোবেল প্রাইজ অস্বীকারের পেছনে তাঁর একটি ভীতিও কাজ করছে যে, এর পরে তাঁর লেখায় হয়ত সীমাবদ্ধতা চলে আসবে। তার পরে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

জাঁ পল সাত্রে প্যারিসে ১৯০৫ সালে ২১ জুন জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিসেই ১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল মারা যান। পুরষ্কার পাওয়ার সময় তিনি ফরাসি দেশের নাগরিক ছিলেন। তাঁর প্রসঙ্গে নোবেল কমিটির মতামত ছিল এই রকম- “for his work which, rich in ideas and filled with the spirit of freedom and the quest for truth, has exerted a far-reaching influence on our age.”

ভিয়েতনামে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্য লা ডাক থো এবং ইউ এস সেক্রেটারি অফ স্টেট হেনরি কিসিঙ্গারকে যৌথভাবে ১৯৭৩ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেওয়া হয়।তবে লা ডক থো জানান, তিনি নোবেল প্রাইজ গ্রহণ করার মতো অবস্থায় নেই কারণ ভিয়েতনামের পরিস্থিতি তখনও শান্ত নয়।লা ডক থো প্যারিসে ১৯১১ সালের ১৪ অক্টোবর ভিয়েতনামের নাম হা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯০ সালের ১৩ অক্টোবর হ্যানয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পুরষ্কার পাওয়ার সময় তিনি ভিয়েতনামের নাগরিক ছিলেন।

এছাড়াও অ্যাডলফ হিটলারের আপত্তিতে জার্মানির রিচার্ড কুন (১৯০০-১৯৬৭), অ্যাডলফ বুটেন্ড (১৯০৩-১৯৯৫) ও গেরহার্ড ডোম্যাগ (১৮৯৫-১৯৬৪) নোবেল প্রাইজ পেয়েও নিতে পারেননি।

রিচার্ড কুন ১৯৩৮ সালে রসায়নে নোবেল প্রাইজ পান। তিনি ক্যারোটেনয়েড এবং ভিটামিনের ওপরে কাজ করেছিলেন। পরের বছর (১৯৩৯) অ্যাডলফ বুটেন্ডও রসায়নে এই মহার্ঘ্য পুরষ্কার পান। তিনি সেক্স হরমোন নিয়ে কাজ করেছিলেন। তবে বুটেন্ড পরবর্তীকালে মেডেল ও ডিপ্লোমা গ্রহণ করেছিলেন। ওই একই বছর শারীরবিদ্যা বা মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। প্রনটোসিলের ওপরে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল প্রভাব নিয়ে কাজ করেছিলেন।

১৯৫৮ সালে বরিস পাস্তেরনাক (১৮৯০-১৯৬০) সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পান।তিনি তা গ্রহণও করেন কিন্তু পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিগৃহীত হলে তা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তি সম্পর্কে বলা হয়েছিল- “for his important achievement both in contemporary lyrical poetry and in the field of the great Russian epic tradition.”

নোবেল পুরষ্কার প্রদানের সময় তিনজন বিজেতা গ্রেফতার ছিলেন বলে তা গ্রহণ করতে পারেননি।এরা হলেন কার্ল ভন অসিটেস্কি (১৮৮৯-১৯৩৮) (শান্তিবাদী ও সাংবাদিক), আং সান সু কি (বার্মি রাজনিতিক) এবং লিউ জিয়াবো (১৯৫৫-২০১৭) (চীনা মানবিধাকার কর্মী)।

কার্ল ভন ১৯৩৫ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেলেও এক বছর বাদে তা গ্রহণ করেন।লিউ জিয়াবো “for his long and non-violent struggle for fundamental human rights in China.”- এই কাজের স্বীকৃতি সরূপ ২০১০ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পান।

Leave a Comment