মার্কাস রাশফোর্ড ভবিষ্যতের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিজেন্ড?

স্পোর্টস ডেস্কঃ ইউরোপিয়ান ফুটবল যারা দেখেন তাদের কাছে মার্কাস রাশফোর্ড নামটা পরিচিত৷ প্রিমিয়ার লীগে গত চার – পাঁচ বহর ধরেই খেলছেন তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে৷ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে আসা এই স্ট্রাইকার দু-এক রাত আগে যেনো প্যারিসের মাঠ থেকে এক উপন্যাসই রচয়িতা করে আসেন৷ ১৯ মাস আগে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের ম্যাচে রাশফোর্ডের গোলেই কপাল পুড়েছিলো প্যারিসিয়ানদের, ঠিক ১৯ মাস পর সেদিন রাতে ও প্যারিয়ানদের বড় ধাক্কা দিলো রাশফোর্ড। ম্যাচের ৮৭ মিনিটের সময় কোণাকুণি শটে গোল করে এওয়ে ম্যাচ থেকে ২ গোল এবং ৩ পয়েন্ট নিয়ে আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

ঘরের মাঠে আর্সেনালের সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হলো মার্কাস রাশফোর্ডের। এবার রেকর্ড গড়েই উপলক্ষটা রাঙালেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্ট্রাইকার। লিগে অভিষেকে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে দুই গোল করলেন ১৮ বছর বয়সী রাশফোর্ড! সঙ্গে একটি অ্যাসিস্টও। তাঁর নৈপুণ্যেই আর্সেনালকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে। তিন দিন আগে ইউরোপা লিগে মিটশেলানের বিপক্ষে অভিষেক রাঙিয়েছিলেন দুই গোল করে।২২ বছর বয়সী রাশফোর্ডকে ঘিরে যেনো ভবিষ্যতে বেশ ভালো পরিকল্পনা করেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ম্যানেজমেন্ট৷ ইংলিশরা চায় রাশফোর্ড বোবি চার্ল্টন, ওয়েন রুনি, স্টিভেন জেরার্ড, ল্যাম্পার্ড, ব্যাকহাম, মিচেন ওয়েন, এলেন শারেয়ার মতো বড় একজন হোক।

২২ বছর বয়সী তরুন এই খেলোয়াড় ফুটবলের পাশাপাশি কাজ করছেন শিশুদের নিয়ে।করোনার সময় এর মধ্যেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড তহবিল সংগ্রহ করেছেন রাশফোর্ড। বধির শিশুদের জন্য ইশারার ভাষা শিখেছেন। শিশুদের নিয়ে এই কাজের ফল হিসেবে পুরস্কার পেলেন রাশফোর্ড। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, ২২ বছর বয়সেই এমন একটা সম্মান পাওয়ায় তিনি আপ্লুত। তবে শিশুদের জন্য আরও অনেক কিছু করার আছে তার। কাজ সবে শুরু। রাশফোর্ড নিজেও যেনো হতে চায় আকাশ সমান একজন বড় মানুষ, পেতে চায় মহাসাগরের সমান মানুষের বুকভরা ভালোবাসা, দোয়া। তরুণ বয়স থেকেই ক্লাব, জাতীয় দল দু জায়গায় নিজের জাত চিনিয়েছে মার্কাস রাশফোর্ড।এভাবে চলতে থাকলে একদিন ঠিকই ইংল্যান্ডের লিজেন্ডারি খেলোয়াড়দের তালিজায় উঠে আসবে তার নাম৷

২০১৬ সালে লুই ভ্যান গালের অধীনে লাল জার্সি পড়ে অভিষেক হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে যাচ্ছেন তিনি।মাত্র ২১ বছরেই ১৫০ ম্যাচ মাইলফলক ছুঁলেন, সামনে পড়ে আছে অফুরন্ত সময়। রাশফোর্ড কি পারবেন ভবিষ্যৎ তারকা হতে? তা সময়ই বলে দিবে। তবে ১৫০ ম্যাচের পর অন্যান্য বিশ্বমানের তারকাদের সাথে পরিসংখ্যানে রাশফোর্ড এগিয়ে আছেন বেশ। তাই তাঁকে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করাটাও অহেতুক নয়।

মার্কাস রাশফোর্ডের ক্লাব ক্যারিয়ারঃ ছেলেবেলা থেকেই রাশফোর্ড ফুটবল খেলতে পছন্দ করতো। মাত্র ৭ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। সে সময় তার আদর্শ ব্রাজিলিয়ান রোনালদো চ্যাম্পিয়নস লীগের ম্যাচকে ঘিরে আসে অল্ড ট্রাফোর্ডে। অল্ড ট্রাফোর্ডে এসেই হ্যাটট্রিক করেন ব্রাজিলিয়ান রোনালদো৷ রাশফোর্ড যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমির খেলোয়াড় ছিলেন তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এরপর রাশফোর্ড বলেন,”আমার জন্য, ফুটবলে এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কিছু নেই। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছেলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমির হয়ে। এরপর ২০১৫-১৬ সিজনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রিমিয়ার লীগে অভিষেক হয় এই ফুটবলারের। প্রথম প্রথম বেঞ্চেই কাটতো তার সময়।

ইউরোপা লীগের ম্যাচ দিয়ে রেড ডেভিলদের হয়ে প্রথম মাঠে নামার সুযোগ পান রাশফোর্ড৷ আর ইউরোপা লিগে মিটশেলানের বিপক্ষে অভিষেক রাঙিয়েছিলেন দুই গোল করে। কিন্তু প্রিমিয়ার লীগে অভিষেক হয় অল্ড ট্রাফোর্ডে, ঘরের মাঠে আর্সেনালের সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হলো মার্কাস রাশফোর্ডের। এবার রেকর্ড গড়েই উপলক্ষটা রাঙালেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্ট্রাইকার। লিগে অভিষেকে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে দুই গোল করলেন ১৮ বছর বয়সী রাশফোর্ড! সঙ্গে একটি অ্যাসিস্টও। তাঁর নৈপুণ্যেই আর্সেনালকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে।

২০ মার্চ ২০১৬ সালে মার্কাস রাশফোর্ড ম্যানচেস্টার ডার্বির এক মাত্র গোলটি করেন। লীগের ম্যাচে ২০১২ সালের পর ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে জয়ের দেখা পায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বয়সে ১৮ বছর ১৪১ দিনের রাশফোর্ড ম্যানচেস্টার ডার্বির সর্বকনিষ্ঠ গোল স্কোরার বনে যান গোল করে৷ সে সিজনের এফ এ কাপে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ট্রফি জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো মার্কাস রাশফোর্ড। এফ এ কাপের ষষ্ঠ রাউন্ড, সেমি ফাইনালের ম্যাচে গোলের দেখা পেয়েছিলো এই ফরওয়ার্ড৷ সে সিজনে রাশফোর্ড ১৮ ম্যাচে ৮ গোল করেন৷৩০ মে রাশফোর্ডের সাথে ২০২০ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ হয় তার ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড৷ ২০১৬-১৭ সিজনে দলে নিজের জায়গা আর ও চওড়া করেন রাশফোর্ড।জোসে মরিনহো তাকে ১৯ নাম্বার জার্সিটি দেয়।

২৭ আগস্ট ২০১৬ সালে হাল সিটির বিপক্ষে এই সিজনে নিজে প্রথম গোল। মাত্র ২১ বছর বয়সে গোল্ডেন বল এওয়ার্ড জিতেছে৷ রাশফোর্ড নিজের ৩য় ট্রফি জয় করেন ইএফএল কাপ ফাইনাল জয় করে৷ সে সিজনের এরপর প্রিমিয়ার লীগের পাশাপাশি উয়েফা ইউরোপা লীগের ট্রফি ও জয় করেছে এই ফরওয়ার্ড৷ সে সিজনে ইউনাইটেডের হয়ে সবচেয়ে বেশী ৫৩ ম্যাচ খেলেছেন এই ফরওয়ার্ড। ২০১৭-১৮ সিজনে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলেন রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে উপলক্ষটা ছিলো উয়েফা সুপার কাপ, দিনটি ছিলো ৮ আগস্ট ২০১৭ সাল৷ ঠিক পাঁচ দিন পর প্রিমিয়ার লীগের ম্যাচে ৪-০ গোলের বড় জয় দিয়ে প্রিমিয়ার লীগের মিশন শুরু করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

২৬ আগস্ট লিস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে চলতি সিজনে নিজের প্রথম প্রিমিয়ার লীগের গোল করেন রাশফোর্ড। সেবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগে তার ডেব্যু ম্যাচেই গোল পায় রাশফোর্ড, চ্যাম্পিয়নস লীগে বাসেলের বিপক্ষে গোল পান তিনি৷ ২৩ অক্টোবর গোল্ডেন বয় এওয়ার্ডের তালিকায় তৃতীয় হন এই খেলোয়াড়।এরপর মার্চে লিভারপুলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে জয় উপহার দেন এই খেলোয়াড়, সে সিজনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের শেষ খেলার গোল স্কোরার ও ছিলেন এই রাশফোর্ডই৷ ২০১৮-১৯ সিজনে রাশফোর্ড দলের ১০ নাম্বার জার্সি পান৷ সে সিজনে রাশফোর্ড প্রথম গোল করেন ২৯ সেপ্টেম্বর।

৩ নভেম্বর বোর্মমাউথের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে দলকে ৩ পয়েন্ট এনে দেন এই নাম্বার ট্যান৷ এরপর বেশ কয়েক ম্যাচ ধরে এসিস্ট, গোল করেছেন এই ইংলিশ ফরওয়ার্ড। ২০১৯ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রথম ম্যাচেই রাশফোর্ড গোল এবং এসিস্টের দেখা পান, ম্যাচটি ছিলো নিউক্যাসেল ইউনাইটেড এর বিপক্ষে৷ ১৩ জানুয়ারি লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে রাশফোর্ডের কল্যাণে ৩ পয়েন্ট পায় রেড ডেভিলরা৷ ২ ফেব্রুয়ারি রাশফোর্ড ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর জানুয়ারির সেরা খেলোয়াড় এবং গোলের জন্য পুরষ্কার পান৷সেই সাথে ইব্রাহিমোভিচের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোনো খেলোয়াড় ইপিএলের প্লেয়ার অফ দ্যা মান্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলো।ঠিক একদিন পরে প্রিমিয়ার লীগে নিজের ১০০ তম ম্যাচে লিস্টারের বিপক্ষে গোল করেন এই ফরওয়ার্ড। ৩০ মার্চ ওলে গানার পার্মানেন্ট দায়িত্ব পাওয়ার পরের ম্যাচে ও রাশফোর্ড গোল করে দলকে উপহার দেন৷ যেনো তিনি হাঁটছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভবিষ্যতের লিজেন্ডদের রাস্তায়৷

মেরিট অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার, বা সংক্ষেপে এমবিই- ব্রিটিশরাজের এই সম্মানসূচক খেতাব পেয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ইংলিশ ফরোয়ার্ড মার্কাস রাশফোর্ড। করোনাকালীন সময়ে ভুক্ত শিশুদের খাবার নিশ্চিত করার কাজ করার পুরস্কার হিসেবে এই সম্মান পেলেন তিনি। স্যার হওয়ার পথেও আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।

এক টুইটার পোস্টে রাশফোর্ড লিখেছেন, “অনেক শিশু আজ রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যাবে। তাদের কাছে মনে হতে পারে যে, তাদের কোনোই মূল্য নেই। আমাদের একে অন্যের দিকে আঙ্গুল তোলা বন্ধ করতে হবে।রাজনৈতিক মতাদর্শের তলে চাপা পড়ছে আমাদের ভাবনা। এই শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, তারা শুধুই সংখ্যা নয়। আমি তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে থাকব।”রাশফোর্ডদের মানুষরাতো এমনিতেই পাবে মানুষের বুকভরা ভালোবাসা।

You might also like
Leave A Reply

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy