আই অ্যাম দ্যা নরমাল ওয়ান ” – ইয়ুর্গেন ক্লপ

স্পোর্টস ডেস্কঃ তরুণ প্রজন্ম হয়তো দেখেছে গত ২-৩ বছরের লিভারপুলকে কিন্ত তারা কি জানে লিভারপুল দলের প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাস?একটা সময় ছিলো যখন প্রিমিয়ার লীগ হবে আর লিভারপুল চ্যাম্পিয়ন হবে এমনটা ও ছিলো একসময়ের লিভারপুল। ৯০ এর পর সমর্থকেরা অন্তত একটা প্রিমিয়ার লীগের ট্রফি আশা করেছিলো, শেষবার লিভারপুলের লিজেন্ড জেরার্ড এর হাত ধরে আবার ও সেই সোনালি ট্রফির দেখা পাবে এটা ও হয়তো আশা করেছিলো অল রেড সমর্থকেরা। কিন্তু ট্রফির বিপরীতে ট্রফিলেস যে ৩০ বসন্ত পর্যন্ত থাকতে হবে তা কে জানে?

ব্রেন্ডন রজার্স খুব কাছাকাছি লিভারপুলকে ট্রফির স্বাদ উপহার দিবে দিবে হয়ে ও সফল হয় নাই। এভারটনের মাঠে ১-১ গোলে ড্র হবার পর মৌসুমের মাঝপথে বরখাস্ত হলেন রজার্স। ২০১৫ সালে অক্টোবর মাসে ‘অলরেড’দের নতুন কোচ হয়ে অ্যানফিল্ডে আসলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। দায়িত্ব নেয়ার সময় ও কি কেউ আন্দাজ করেছিলো যে উনিই ভবিষ্যতে লিভারপুলকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ ক্লাব বানাবে? উনিই লিভারপুলকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ট্রফির স্বাদ দিবে? উনিই লিভারপুলকে দু’দুবার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালের মঞ্চে নিয়ে যাবে লিভারপুলকে?

লিভারপুলের দায়িত্ব পাওয়ার আগে ইয়ুর্গেন ক্লপ বেশ কয়েক বছর বুন্দেসলীগার টিম বুরুশিয়া ডর্টমুন্ডের দায়িত্বে ছিলেন৷ ডর্টমুন্ডের হয়ে নিজের প্রথম আসরে জার্মান সুপার কাপে বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে ডর্টমুন্ড চ্যাম্পিয়ন হয়৷ ডর্টমুন্ডকে বুন্দেসলীগার চ্যাম্পিয়ন করায় ২০১১, ২০১২ সালে৷ ২০১২-১৩ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে নিয়ে গিয়েছে দলকে এরপর ভালো পারফরম্যান্স উপহার দিলে ও সাফল্য নামের সোনার হরিণের দেখা পান লিভারপুলে এসে৷

লিভারপুলে ইয়ুর্গেন ক্লপঃ ৮ ই অক্টোবর, ২০১৫ তে ক্লপ ব্রেন্ডন রজার্সের পরিবর্তে লিভারপুল ম্যানেজার হওয়ার জন্য তিন বছরের চুক্তিতে সম্মত হন। এল পেইসের মতে, লিভারপুলের সহ-মালিক জন ডব্লু। হেনরি জনগণের মতামতকে বিশ্বাস করেননি তাই তিনি মানিবলের মতো একটি গাণিতিক পদ্ধতির সন্ধান করেছিলেন, হেনরি বোস্টন রেড সোক্সের জন্য তিনটি বিশ্ব সিরিজ জয়ের পথে পরিচালনার জন্য যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপের মাধ্যমেও মালিক হন গাণিতিক মডেলটি ক্যামব্রিজের পদার্থবিজ্ঞানী আয়ান গ্রাহামের হয়ে উঠল, যা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের জন্য লিভারপুলের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যানেজার, ক্লপ এবং খেলোয়াড়দের বেছে নিতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

ক্লপ তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তার নতুন দিকটি বর্ণনা করে বলেছিলেন যে “এটি কোনও সাধারণ ক্লাব নয়, এটি একটি বিশেষ ক্লাব। আমার দুটি খুব স্পেশাল ক্লাব ছিল মাইনজ এবং ডর্টমুন্ডের সাথে। এখানে থাকার এবং চেষ্টা করার জন্য এটি আমার পরের সঠিক পদক্ষেপ এবং সহায়তা “এবং চার বছরের মধ্যে ট্রফি সরবরাহ করার তার উদ্দেশ্যটি উল্লেখ করে, তাঁর প্রথম সম্মেলনের সময় ক্লপ ২০০৪ সালে হোসে মরিনহোর বিখ্যাত ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ বিবৃতিটির একটি প্যারোডিতে নিজেকে ‘দ্য নরমাল ওয়ান’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ক্লপ তার অধীনে থাকা খেলোয়াড়দেরকে তার সব কৌশল রপ্ত করা এবং তার কৌশল রপ্ত করতে পারবে এমন ফুটবলারের সন্ধানে ছিলো এবং সংবাদ সম্মেলনে যখন বলেছিলো, ” আই অ্যাম দ্যা নরমাল ওয়ান ” তখনই বলার সাথে সাথে সব সাংবাদিকরা হেসে উঠলো।

২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ সালে, লিভারপুল পেনাল্টিতে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ওয়েম্বলিতে ২০১৬ লিগ কাপের ফাইনাল হেরেছে। ১৭ মার্চ ২০১৬ সালে ক্লপের লিভারপুল উয়েফা ইউরোপা লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে। ১৪ ই এপ্রিল ২০১৬ সালে , লিভারপুলের কোচ ক্লপ তার প্রাক্তন ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের দ্বিতীয় লেগে ৩-১ দ্বিতীয়ার্ধের ঘাটতি থেকে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে লড়াই করে সেমিফাইনালে ৫-৪ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। ৫ মে ২০১৬ সালে ক্লপ উয়েফা ইউরোপা লিগের সেমি-ফাইনালে ভিলাররিয়ালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ২০০৭ সালের পর লিভারপুলকে তাদের প্রথম ইউরোপীয় ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছিল। ফাইনালে লিভারপুল সেভিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল, প্রথমার্ধে লিভারপুলের হয়ে উদ্বোধনী গোলটি করে ড্যানিয়েল স্টুরিজের লিভারপুলের হয়ে প্রথম গোল করলে ও ১-৩ গোলে হেরেছিল। লিভারপুল ২০১৫-১৬ সিজনে অষ্টম স্থানে শেষ করেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ।

২০১৮-১৯ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ক্লপের দল নক আউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের গোলে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে রাউন্ডে ড্র, প্রথম লেগে একটি স্কোরলেস ড্র,তার পরে ৩-১ আলিয়াঞ্জ অ্যারিনায় দ্বিতীয় লেগে জয়ের মুখোমুখি লিভারপুল কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ] লিভারপুল তাদের কোয়ার্টার ফাইনাল পোর্তোর বিপক্ষে ৬-১ গোলে পরাজিত করে সেমিফাইনালে উঠেছে, যেখানে ক্লপের লিভারপুল টুর্নামেন্ট ফেভারিট বার্সেলোনার মুখোমুখি হয়েছিল] ন্যু ক্যাম্পে ৩-০ ব্যবধানে পরাজয়ের পরে,ক্লপতার খেলোয়াড়দের অনফিল্ডে দ্বিতীয় লেগে “চেষ্টা করে” বা “সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে ব্যর্থ” হওয়ার কথা বলেছে। দ্বিতীয় লেগে ক্লপের দলটি ৪-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে, চূড়ান্তভাবে মোহামেদ সালাহ এবং রবার্তো ফিরমিনোকে ইনজুরিতে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মোট ৪-০ ব্যবধানে চূড়ান্ত পথে এগিয়ে যায়, যা চ্যাম্পিয়নস লীগে অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

লীগের ইতিহাস টটেনহ্যাম হটস্পুরের বিপক্ষে মাদ্রিদের মেট্রোপলিটনো স্টেডিয়ামে ফাইনালে লিভারপুল মোহামেদ সালাহ এবং ডিভক অরিগির গোলে ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল, ক্লপকে তার প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিভারপুলের সাথে প্রথম ট্রফি দিয়েছিল এবং ক্লাবটির ষষ্ঠ ইউরোপীয় কাপ / চ্যাম্পিয়নস লিগ সামগ্রিক শিরোনাম। এর আগের বছর চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনাল খেললে ও রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ধাক্কা খেয়ে ট্রফি ছোঁয়া হয়নি ক্লপের৷ এরপর লিভারপুলকে উয়েফা সুপার কাপ, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাল জিতাতে ও সাহায্য করেছিলেন ক্লপ৷ কিন্তু ইংলিশ এই ক্লাবকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ট্রফি স্বাদ এনে দেন ক্লপ ২০১৯-২০ সালে৷ সে সিজনে লিভারপুল ৪৪ ম্যাচে আনবিটেন ছিলো এবং সিজন শেষে প্রিমিয়ার লীগের প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যানেজার এর পুরষ্কার আসে ক্লপের হাতে৷

এর আগে ক্লপ দলের ম্যানেজার হিসেবে আসার পর অনেক খেলোয়াড় ও চলে গিয়েছিলো ক্লাব ছেড়ে। ৪-২-৩-১ এর ফরমেশন ছেড়ে অন্যরকম ৪-৩-৩ ফরমেশন এর আক্রমনাত্মক লিভারপুলকে দেখতে পেলো অল রেড সমর্থকেরা। ততদিনে হেন্ডারসন, মিলনার এবং ভাইলানদমেরা মাঝমাঠ শক্ত করেছে, শুধু দরকার ছিলো ভালো সেন্টারব্যাকের। ১৭-১৮ মৌসুমে আর্নল্ড ও রবার্টসন প্রিমিয়ার লিগে মোট অ্যাসিস্ট করেন ৪৯টি। সেন্টারব্যাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ক্লপ দলে ভিড়িয়ে আনেন ভার্জিন ভ্যান ডাইক। ভ্যান ডাইকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারনে লিভারপুল দল ভ্যান ডাইকের ১৪ ম্যাচের ৭ ম্যাচে গোল হজম করেনি একটি ও। ২০১৭-১৮ মৌসুমে সিটির কাছে এক ম্যাচ হেরে প্রিমিয়ার লীগের দ্বিতীয় স্থানে থাকতে বাধ্য করে। সালাহ, ফিরমিনহো এবং সাদিও মানের ফর্মে থাকলে ও লীগ ট্রফি আর ছুঁতে পারেনি৷

এরপর চ্যাম্পিয়ন লীগের ফাইনালের মঞ্চে লরিস এর পারফরম্যান্স লিভারপুলকে ডুবিয়েছিলো, লিভারপুলের গোলরক্ষক কোচ এবং ক্লপ রোমা থেকে লিভারপুলে উড়িয়ে আনলো অ্যালিসন বেকারকে। এরপরই দলে কিছুটা অদল বদল করেই বাজি মাত করলেন ক্লপ।

চ্যাম্পিয়নস লীগের গ্রুপ পর্বে ২য় স্থান হয়ে নক-আউট পর্বে জায়গা করে নেয় লিভারপুল। অতঃপর, বায়ার্ন ও পোর্তোকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তারা। সেমিতে প্রতিপক্ষ ছিলো বার্সালোনা। ক্যাম্প নু’তে ৩-০ গোলে হেরে গেলেও নাটকীয়ভাবে এনফিল্ডে ৪-০ গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় লিভারপুল। ফাইনালে প্রতিপক্ষ টটেনহ্যাম । অরিগি ও সালাহদের গোলে চ্যাম্পিয়নস লীগের ট্রফি ও জয় করলেন ক্লপ।

এই ধারবাহিকতায় ৩০ বছরের আক্ষেপ, হতাশা, কষ্ট শেষ করে সোনালি ট্রফির দেখা ও ক্লপের হাত ধরে পায় লিভারপুল। নিজেকে ” আই অ্যাম দ্যা নরমাল ওয়ান” বললে ও নিজেকে নিয়ে গিয়েছে এখন অনন্য উচ্চতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *