ইকোশিয়া: এক বিলিয়ন গাছ লাগানো সার্চ ইঞ্জিন!

ইন্টারনেটের কোনও সার্চ ইঞ্জিনে ক্লিক করলে এই গ্রহের অন্য কোনও প্রান্তে একটি চারা রোপণে সাহায্য করবেন আপনি।

প্রতিনিয়ত আমরা ইন্টারনেটে অনেক কিছুই খুঁজি। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারনেটে ব্যয় করেন। এর নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা হরহামেশাই শোনা যায়। কিন্তু এখানেও অনেক ভালো কাজ করেন,তেমনই একটি উদ্যোগ ‘ইকোশিয়া’ (Ecosia)। ইকোশিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের মহোৎসবে অংশ নিতে পারবেন যেকেউ।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনের নব শিল্পদ্যোগী ক্রিশ্চিয়ান ক্রোল ২০০৯ সালে এমনই একটি সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইকোশিয়া নামে ওই সার্চ ইঞ্জিন কাজ করে একদম গুগল সার্চ ইঞ্জিনের মতোই। কিন্তু গুগলের মতো ধনী মালিককে আরও ধনী করার বদলে ইকোশিয়ার লভ্যাংশের ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গাছ পোঁতার কাজে।

ক্রোল কয়েক বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা এবং নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তখনই তিনি অনুধাবন করেন ওই সব এলাকায় দারিদ্রের অন্যতম কারণ নির্বিচারে গাছ কাটা। কারণ পেরুর একটা বড় অংশে কোকেন চাষের জন্য বহু একর বনভূমি সাফ করে দেওয়া হয়েছিল। ক্রোলের মতে, গাছ থেকে খুব সহজেই রুজি রোজগার করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য যে বিশাল সংখ্যায় গাছ রোপণ হত। সেই অর্থ বা সময় একা তাঁর পক্ষে ব্যয় করা সহজ ছিল না। তারপরই ইকোশিয়া শুরু করার কথা মাথায় আসে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ছাত্র ক্রোলের। ইকোশিয়ার বিজ্ঞাপনের রেভিনিউ থেকে লভ্যাংশ বিলি করা হয়। তাই আপনি যতবার ইকোশিয়া ক্লিক করবেন তত বেশি গাছ রোপণে সাহায্য করবেন।

ইকোশিয়া কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, কোনও ব্যক্তি ৪০ বার ইকোশিয়া সার্চ করলেই একটা গাছ রোপণ হয়ে যায়। বর্তমানে সারা দেশে ৭০ লক্ষ মানুষ ইকোশিয়া সার্চ করছেন! আর ওই মানুষরা সবাই ৫ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি গাছ রোপণে সাহায্য করেছেন ইকোশিয়ার মাধ্যমে। এভাবেই একসময় কোকেন চাষের জন্য ফাঁকা হয়ে যাওয়া পেরুর সান মার্টিন অঞ্চলের বনভূমি ফের সবুজ হয়ে উঠেছে।

ব্রাজিল, পেরু, কলম্বিয়া, স্পেন, হাইতি, উগান্ডা, বুরকিনা ফাসো, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সেনেগাল ও মাদাগাস্কারে মোট ১ বিলিয়নের বেশি গাছ লাগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি । অ্যালেক্সায় ৪৩১ তম অবস্থানে থাকা ওয়েবসাইটটি কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালের এপ্রিলে বিজনেস কর্পোরেশন বা সংক্ষেপে বি-কর্পোরেশন সনদ লাভ করে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করা অলাভজনক সংস্থাকে দেওয়া হয় এটি।

ইকোশিয়ার হেড অফিসের ৩০ জন কর্মকতার অধীনে বিশ্বজুড়ে কাজ করে প্রায় দশ হাজার মানুষ। যেসব অঞ্চলে গাছ লাগানো হয় সেখানকার জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালীদের হাতে থাকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার। ২০০৯-এ শুরু করার পর এখন পর্যন্ত বৃক্ষরোপণে ব্যয় করেছে ১,২৮,৫৮,৭৭০ ইউরো। ইকোশিয়ার স্বপ্নবাজ দলটির লক্ষ্য ছিল কমপক্ষে এক বিলিয়ন গাছ লাগানো। ১৫টি দেশে ২০টি প্রকল্পের আওতায় ৯ হাজারেরও বেশি জায়গায় সেই মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেছে তারা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে।

এক বিলিয়ন গাছ লাগিয়ে ফেলেছে সার্চ ইঞ্জিনটি। বছরের শুরুতে অসম্ভবকে সম্ভব করার দিকে একধাপ এগিয়ে গিয়েছিল তারা, যখন ইকোশিয়াকে বিশ্বের ৪৭টি দেশে প্রধান সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ক্রোম আর ফায়ারফক্সের মাধ্যমে একে অতি সহজে প্রধান ব্রাউজারে রূপান্তর করা যাবে।

তবে ক্রোল এবং ইকোশিয়া কর্তৃপক্ষের আক্ষেপ আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে তাঁদের সার্চ ইঞ্জিন। তাহলেই পৃথিবীকে সবুজ করার কাজে কিছুটা এগনো যাবে। কারণ এখন যেখানে সারা বিশ্বে ৯০ শতাংশ লোক গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে সেখানে জার্মানির মাত্র এক শতাংশ মানুষ ইকোশিয়া সার্চ করে। তার ফলেই এপর্যন্ত মাত্র নয় মিলিয়ন ইউরো গাছ রোপণ কাজে ব্যয় করতে পেরেছে ইকোশিয়া। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে সারা বিশ্বের দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্রোল বলছেন, যদি গুগলের বাজারের মাত্র ১০ শতাংশও ইকোশিয়া পেয়ে যায় তাহলেই বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করে পৃথিবীর অর্ধেক অংশে সবুজায়ন করতে পারবেন তাঁরা।

Leave a Comment