মোর্স কোডের আদ্যোপান্ত,কেন মোর্স কোড ব্যাবহার করা হয়?আসুন জানি বিস্তারিত

সভ্যতার শুরু থেকেই ভাবের আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভাষা। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে ভাষার বিবর্তনও থেমে থাকেনি। আস্তে আস্তে মানুষ মুখের ভাষাকে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন দ্বারা লিখতে শিখেছে। আর তারই সূত্র ধরে, মানুষ আজ দোয়াত-কালি থেকে ইলেকট্রনিক মেইল/টেলিগ্রাম নিজেদের পছন্দ মতো তথ্য আদান-প্রদান করছে। তবে, কিছুকাল আগেও কম সময়ে সহজ কিছু সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদানে জনপ্রিয় একটি মাধ্যমের প্রচলন ছিলো।

বড় বড় শো রুম গুলোতে যখন আমরা কোন কিছু কিনতে যায় তখন তারা পিস্তলের মত ছোট একটি যন্ত্র দিয়ে কোন কিছুর উপর লাল রঙের লেজার ফেলে আর সাথেসাথেই তার সামনে থাকা কম্পিউটারে সেই জিনিসের নাম ও দাম উঠে যায় , যে খানে তারা লাইট ফেলে সেখানে থাকে সাদা কালো হিজিবিজি কিছু লাইন । আমাদের মত সাধারন মানুষের কাছে এই হিজিবিজির কোন মূল্য না থাকলেও এই হিজিবিজি লাইন দিয়েই আজকে বড় বড় বিক্রয়োত্তর প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যাবসাকে সহজ করে তুলেছে। একে আমরা বারকোড বলে থাকি , এত কথা আসলে শুধু শুধু বলা হল , কারন বারকোড নিয়ে কোন কথাই বলব না , এখন বার কোডের কালো সাদা হিজিবিজি জিনিসের মত আরেকটি পুরাতন কোড সিস্টেম রয়েছে যাকে আমরা বলি “মোর্স কোড”।

মোবাইল ফোন তথা টেলিফোন উদ্ভাবনের অনেক আগে থেকেই মানুষ মোর্স কোডের মাধ্যমে যোগাযোগ করতো। ১৬০ বছর বয়সী যোগাযোগের এই মাধ্যমটি এখনো অপেশাদার রেডিও ব্যবহারকারীদের মধ্যে, বিমানে এবং কিছু কিছু জাহাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও সামরিক জরুরি ও গোপন সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রেও এটির ব্যবহার রয়েছে।

শুধুমাত্র ডট (.) আর ড্যাশ (-) ব্যবহার করে ইংরেজি অক্ষর আর সংখ্যাগুলোকে প্রকাশ করার পদ্ধতি হচ্ছে মোর্স কোড।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে মোর্স কোড হচ্ছে ইনফরমেশন ট্রান্সপার করার এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে অক্ষরগুলোকে আলো বা শব্দের লং বা শর্ট সিগনালের কম্বিনেশনে উপস্থাপন করা হয়।

স্যামুয়েল মোর্স ১৮৪০ সালে বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ যোগাযোগের জন্য প্রথম এ কোড তৈরি করেন। প্রথম মোর্স কোড বার্তাটি ছিল, “What hath god wrought?” যা ওয়াশিংটন থেকে বাল্টিমোরে পাঠানো হয়েছিল।তার নামানুসারে এই কোডের নামকরণ করা হয়েছে ‘মোর্স কোড’। তিনি ১৮৩২ সালে থেকে এটি নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং মোটামুটি ১৮৪৪ সালে একটি রুপ প্রদান করেন। ১৮৪৪ সালে স্যামুয়েল এফ বি মোর্স কংগ্রেসের সামনে তার সিস্টেমটি প্রদর্শন করেন এবং ৪০ মাইল দূরে প্রথম সফলভাবে একটি মেসেজ ট্রান্সমিট করেন। এজন্য মার্কিন কংগ্রেস তাকে ৩০,০০০ ডলার প্রদান করেছিলেন।১৮৪৯ সালে তার সিস্টেমটি বিস্তার লাভ করে এবং ১৮৫১ সালে ইন্টারন্যাশনাল মোর্সকোড প্রনয়ণ করা হয়। তবে প্রথমদিকে মোর্স কোড নিয়ে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায়নি।

রেডিও যোগাযোগের জন্য মোর্স কোড প্রথম দিকে ব্যপক ব্যবহৃত হত। এমনকি বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকেও টেলিগ্রাফ লাইন, সমুদ্রের নিচে কেবল এবং রেডিও সার্কিটে দ্রুত গতির যোগাযোগ করা হত মোর্স কোডের সাহায্যে। সাধারনত “ডট(ডিট)” এবং “ড্যাশ(ডাহ্)” এর মাধ্যমে কোন ভাষার letters, numerals, punctuation এবং special characters প্রকাশ করা হয়। পেশাগত ভাবে পাইলট, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনকারী, জাহাজের ক্যাপ্টেন, সামুদ্রিক স্টেশন চালনাকারীদের মোর্সকোডে খুবই ভাল দক্ষতা থাকতে হয়।

আকাশে বিমান চালানোর সুবিধার্থে গঠিত বিভিন্ন বেইজ স্টেশন যেমন VHF Omni-directional Radio Range (VORs); Non-Directional Beacon (NDB) আকাশে চলমান বিমানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জন্য প্রতিনিয়ত নিজেরদের অস্তিত্ত্ব জানান দিতে মোর্স কোডের ব্যবহার করে।

কিন্তু,১৯০৫ সালে যখন জার্মান সরকার এই কোড ব্যবহার করে একটি দুর্যোগ বিপর্যস্ত জাহাজকে উদ্ধার করে তখন থেকেই এই সংকেতটি বিশ্ব বেশ সাড়া ফেলেছিল। তারপর থেকেই তিনটি ড্যাশ এবং তিনটি ডট এর পুনরাবৃত্তি মূলক প্যাটার্নটি হয়ে যায় ইমার্জেন্সি কেসে বহুল ব্যবহিত একটি সংকেত।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডেরাল কমিউনিকেশন কমিশন এখনো সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য মোর্সকোড ব্যবহার করে। নেভি সিল সহ বড় বড় গ্রুপ গুলো পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে সিগনাল পাঠাতে কিছু কিছু সময় মোর্স কোড ব্যবহার করে।মোর্স কোডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি নানারকম ভাবে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যায়। শব্দ, চিহ্ন, পাল্স, রেডিও সিগনাল, রেডিও অন অফ, আয়নার আলো, লাইট অন অফ ইত্যাদি নানা উপায়ে মোর্সকোডের মাধ্যমে তথ্য প্রেরন করা যায়। একারণেই S O S মেসেজ পাঠানোর জন্য মোর্স কোড সবচেয়ে উপযোগী। SOS হল এক কথায় বলতে গেলে বিপদে উদ্ধার আহবানের সিগনাল , এর পূর্ন রূপ হচ্ছে “Save our Souls”।

মোর্স কোডে তিনটি ডট অক্ষর S এবং তিনটি ড্যাশ অক্ষর O তৈরি করে, তাই এসওএস (SOS) কোডের ক্রমটি দ্বারা
Save Our Ship অথবা Save Our Soul বুঝায়, অর্থ্যাৎ জরুরি মুহূর্তে সাহায্যের জন্য SOS ক্রমটি ব্যবহার করা হয়। পেশাগত দিক থেকে, পাইলট, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী, জাহাজের ক্যাপ্টেন, সামুদ্রিক স্টেশন চালনাকারীদের মোর্সকোডে ভালো দক্ষতা থাকা আব্যশক। আকাশে বিমান চালানোর সুবিধার্থে গঠিত বিভিন্ন বেইজ স্টেশন যেমন VHF Omnidirectional Radio Range (VORs), Non-directional Beacon (NDB) আকাশে চলমান বিমানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিনিয়ত মোর্স কোড ব্যবহার করে। এছাড়াও, মোর্স কোডকে ভিক্টোরিয়ান ইন্টারনেটও বলা হয়। এটি সারা বিশ্বের বেশিরভাগ জরুরি সংকেত বহনে দ্রুত ও কার্যকরী ফলাফল প্রদান করে।

কিভাবে মোর্স কোড তৈরী করব , অনলাইনে বিভিন্ন সাইট আছে যেখানে সহযেই আপনি একটি ওয়ার্ডের মোর্স কোড পাঠাতে পারবেন । তবে আমরা কাগজে কলমেই মোর্স কোড একটু শিখে ফেলি , বাকি জিনিস ঘাটাঘাটি করতে করতে আপনারা নিজেরাই শিখে ফেলতে পারবেন । তবে মোর্স কোডের সিগনাল বুঝতে বা পাঠাতে এর উপর অনেক দক্ষতা থাকতে হয় খুব সহজে এটি আয়ত্ত করা হয়ত সম্ভব না , প্রথমেই মোর্স কোডের কোন বর্নটি কি দিয়ে প্রকাশ করা হয় তা নিচের ছবিতে দেয়া চার্ট দেখে বুঝে নেই ,

আমরা SOS দেখি ,
S স্থানে এখানে ৩ টি ডট …
o স্থানে ৩ টি ড্যাশ —

অর্থাৎ আমরা যদি কাওকে SOS সিগনাল পাঠাতে যাই তো আমাদের মোর্স কোড হবে …—… আপনারা চাইলে ইউটিউব বা গুগল থেকে SOS এর মোর্স কোডে সাউন্ড সিগনাল টি দেখে আসতে পারেন , তাহলে হয়ত ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে , প্রতিটি বর্নের মাঝে সাউন্ড সিগনালে অল্প ব্যাবধান থাকে এবং একটি ওয়ার্ডের পর একটু বেশী সিগনাল গ্যাপ থাকে যা থেকে শব্দ ও বর্ন আলাদা ভাবে বুঝা যায় ।

ভাল জিনিশ শিখিয়ে দিলাম , মোর্স কোড দিয়ে নিজের নাম খাতায় বা বই এ দিয়ে রাখুন , প্রিয়জনকে মনের কথা বলতে পারছেন না …… মোর্স কোড দিয়ে পাঠিয়ে দিন , কিছু বুঝুক আর না বুঝুক আপনি মনের কথা বলে দিয়েছেন , এই যা স্বান্তনা ।

Leave a Comment