চট্টগ্রামে কোভিড-19 আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজন ডায়বেটিক রোগী-গবেষণা রিপোর্ট

চট্টগ্রামে কোভিডে আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজন ডায়বেটিক রোগী। পুরুষ এবং ৩১-৫০ বছরের ডায়বেটিস রোগীরা সম্মুখীন হচ্ছেন সবেচেয়ে বেশী শারীরিক জটিলতার। কোভিড-১৯ পরবর্তি প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশী পর্যবেক্ষিত হয় ডায়বেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাদের মধ্যে পঁচাত্তরভাগ ডায়বেটিস রোগী কোন না কোন দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে এসব তথ্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও বিআইটিআইডি’র যৌথ গবেষণার এ তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষনা প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার এর “ডায়বেটিস এন্ড মেটাবলিক সিনড্রোমঃ ক্লিনিক্যাল রিসার্চ এন্ড রিভিউস” শীর্ষক গবেষনা নিবন্ধে ।

কেন ডায়বেটিস ও কোভিড-১৯ নিয়ে গবেষণা?–পৃথিবীতে প্রতি দশজনে একজন ডায়বেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় নব্বই লক্ষ লোক ডায়বেটিসে আক্রান্ত এই মুহুর্তে এবং সমপরিমান লোককে এখনও সনাক্তকরানের আওতায় আনা যায়নি। চট্টগ্রামে প্রায় দশ লক্ষ লোক ডায়বেটিসে আক্রান্ত। পৃথিবীতে ডায়বেটিসে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ অষ্টম। ডায়বেটিসের তীব্রতার কারনে কোভিডের সাথে ডায়বেটিসের সম্পর্ক, প্রতিক্রিয়া, সুস্থ হতে জটিলতা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা জরুরী।

কেন ডায়বেটিস ঝুকিপুর্ন? আন্তর্জাতিকভাবেও ডায়বেটিসকে কভিড এর জন্য ঝুকিপুর্ন চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডায়বেটিস ফেডারেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মাঝে ২০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ, এবং চীনে দশ শতাংশ রোগী ডায়বেটিক। চট্টগ্রামে ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর তীব্রতা, উপসর্গ এবং কোভিড পরবর্তি অবস্থা নিয়ে সম্পাদিত এই গবেষনাটি কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার চার সপ্তাহ পর রোগীদের মাঝে পরিচালনা করা হয়।

নতুন ডায়বেটিস- আশঙ্কাজনক তথ্যঃ চট্টগ্রামে প্রতি ১.৪ শতাংশ কোভিড রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠার পর নতুনভাবে ডায়বেটিস সনাক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে এইচবিএওয়ানসি টেস্টের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তিতে ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য অন্যান্য দেশেও পাওয়া গেছে। ইতিপুর্বে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইটালি ও সিংগাপুরে অনেকেই কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর নতুনভবে ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়েছে বলে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন এ প্রকাশিত হয়েছে।

কেমন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে কোভিডের দিনগুলোতে? কভিডে আক্রান্ত চল্লিশ শতাংশ ডায়বেটিস রোগীকেই ইনসুলিন এর মাত্রা তিনগুন করতে হয় রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য।

কোন উপসর্গ বেশী? কডিভ আক্রান্ত ডায়বেটিস রোগীদের নব্বই ভাগেরই জ্বর, ষাট ভাগের কফ ও কাশি এবং পঁয়তাল্লিশভাগের শারীরিক ব্যথা পর্যবেক্ষিত হয়েছে। ষাট ভাগের অধিক রোগীর ফেরিটিন ও ডি ডাইমারের পরিমান অধিক পাওয়া গেছে।

ডায়বেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে উপসর্গবিহীন হওয়ার সংখ্যা কম। মাত্র চার শতাংশ ডায়বেটিস রোগীর মধ্যে কভিড আক্রান্ত হওয়ার পর কোন উপসর্গ বা লক্ষন পর্যবেক্ষিত হয়নি কিন্তু ডায়বেটিসবিহীন কোভিড রোগীদের মধ্যে বেশী উপসর্গবিহীন হওয়ার মাত্রা দেখা গেছে।

আমার চিকিৎসক সহ-গবেষকদের গবেষণায় আগ্রহ ও শ্রম দেখে আমি মুগ্ধ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই আমাকে প্রতিদিন ফোন করে গবেষণার আইডিয়া শেয়ার করত Dr. Farhana Akter এবং Dr. Hamidullah Mehedi Hmh। প্রতিদিনই কোন না কোন কভিড ডায়বেটিক রোগীর চিকিৎসা করতেন তারা আর বের করতেন গবেষনার নতুন নতুন সব তথ্য। অনেক অনেক ধন্যবাদ চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডাঃ আবদুর রব মাসুম ও বিআইটিআইডি এর ল্যাবপ্রধান ও অণুজীববিজ্ঞানী ডাঃ Shakeel Ahmed কে তথ্য যাচাই বাছাইয়ে সাহায্য করার জন্য। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষনে ছিল আমার সহকর্মী Mahbub Hasan। অনেক কভিড রোগীর সাথে নিজের ঝুকি উপেক্ষা করে দেখা করার মত দুঃসাহস পর্যন্ত দেখিয়েছে এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ নেতৃত্ব দেয় আমার দুই গবেষণা শিক্ষার্থী আসমা সালাউদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন মিয়াজি। অনেক অনেক ধন্যবাদ ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপের তুখোড় সেচ্ছাসেবকদের।

এটা খুব সামান্য একটা গবেষনা। খুব আহামরি ইমপ্যাক্ট এর না। এখনও মলিকুলার বা জেনেটিক পর্যায়ে আমরা যাইনি, একটু একটু করে সেদিকে আগাচ্ছি। কিন্তু এটা সমস্যা চিহ্নিত করার একটা প্রয়াস। আমাদের সমস্যাগুলো আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে, আমাদেরকেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের উপায় বের করতে হবে। বিদেশ থেকে কোন আলাদিন এসে সেটা করে দিয়ে যাবেনা। কাজটি করার সময় কোভিডে মৃত্যুবরনকারী আমার ছোট খালু ডাঃ গোলাম মোস্তফার কথা মনে হচ্ছিল। আর কয়েকদিন আগে কোভিডে হারালাম বড় নানু ফাতেমা খাতুনকে। আর একজনকেও আমি হারাতে চাইনা। চাই অনেক অনেক বেশী গবেষনা।প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হয়েছে এখানেঃ ScienceDirect