‘কনডেম সেল’-মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ফাসির আসামীদের শেষ দিন গুলোর সাক্ষী নির্জন রুম !

ফাঁসি !খুবই বেদনাদায়ক এক অনুভুতি । লিখে কিংবা বলে আপন জনের এই বিদায়ের বিষোদগার ব্যক্ত করা পৃথিবীর কাহারো পক্ষেই হয়তো সম্ভব নয় । মৃত্যুর আগে কত বার যে মরতে হয় তা কেবল দন্ড প্রাপ্ত ফাঁসীর আসামী বলতে পারে ।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামীদের জেলখানার যে নির্জন কক্ষে রাখা হয়, তাকে কনডেম সেল ( Condemned Cell) বলে। আদালতে ফাঁসির রায় ঘোষণার পর আসামিকে কারাগারের কনডেম সেলে নেওয়া হয়। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত আসামিদের কনডেম সেলেই রাখা হয়।

দায়রা আদালত যখন মৃত্যুদণ্ড দান করেন, তখন হাইকোর্ট বিভাগের নিকট কার্যক্রম পেশ করবেন। ( CrPC-ধারা ৩৭৪)।ডেথ রেফারেন্স মামলাটি নিশ্চিতকরণের জন্য উপস্থাপন করা হলে আদালতের দায়রা সিদ্ধান্তটি হাইকোর্ট দ্বারা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হতে পারে।( CrPC- ধারা ৭৬) হাইকোর্ট বিভাগ উহা অনুমোদন দেয়ার পূর্বে একজন আসামী দীর্ঘ সময় এই কনডেম সেলে থাকতে হয়। ২০ বছর কনডেম সেলে থেকে খালাস পেয়েছে এমন নজিরও রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার রয়েছে। বাংলাদেশে ৬৮ কারাগারে মোট ৮৮৮ জন বন্দী কনডেম সেলে আছেন। সাধারণ বন্দী ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য থাকা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এক নয়। এখন অন্য বন্দীদের থাকার জায়গার সঙ্গেও কনডেম সেলের বেশ পার্থক্য আছে। একজন বন্দী থাকার কনডেম সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের থাকে। আবার অনেক কারাগারে সেলের মাপ কিছুটা বড় থাকে। কনডেম সেলের মধ্যে বন্দীর থাকা-খাওয়া, গোসল ও টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে।একটি কনডেম সেলে সাধারণত একজন বা তিনজন বন্দী রাখা হয়।

বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে রাখার মতো কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তাঁদের আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হয়। এটিকে একধরনের রেওয়াজ বলা যেতে পারে। কনডেম সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য ছোট আকারের জানালা থাকে। সাধারণত ধারণা করা হয়, কনডেম সেলে দুজন বন্দী থাকলে তাঁরা কারাগার থেকে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারেন। তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ওই ধারণা থেকেই দুজন বন্দীকে একটি কনডেম সেলে রাখা হয় না। আর এই সেলে থাকা বন্দীদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দীকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই।

আগে কনডেম সেলের বন্দীদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু একটি ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই বর্তমানে কনডেম সেলের বন্দীদের দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেওয়া হয়। কনডেম সেলে থাকা বন্দীরা মাসে এক দিন দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেম সেলের আসামির সঙ্গে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেওয়া হয়। তারা কারাগার শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান প্রোগ্রাম থেকে বাদ পড়ে।

দন্ডপ্রাপ্ত আসামী কে গভীর রাতে ফাঁসি দেওয়ার পিছনে বেশ কয়েকটি কারন রয়েছেঃ

১। আইন অনুসারে একটি ফাঁসি সংঘটিত করতে জেল কর্তৃপক্ষকে অনেকগুলো কাজ ধাপে ধাপে করতে হয়। নানান খাতাপত্রে একাধিক বিষয় নথিভূক্ত করতে হয়। ফলে গভীর রাতে প্রক্রিয়াটা শুরু করলে ব্যাপারটা অনেকটা আগেই মিটে যায়। এর ফলে, জেলের দৈনন্দিন কাজে আর কোনও ব্যাঘাত ঘটে না বা দেরি হয় না।

২। অনেক ক্ষেত্রেই ফাঁসির সাজার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজে জনমত তৈরি হয়। বিভিন্ন গণআন্দোলন ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই গভীর রাতকেই বেছে নেওয়া হয় জেলের তরফ থেকে যখন সাধারণত সকলেই ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন।

৩। ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়াই রেওয়াজ। তাই, ফাঁসি সূর্যদয়ের আগেই ঘটে গেলে দেহটা পরিজনদের হাতে সকাল সকালই তুলে দেওয়া যায়। যার ফলে পরিবারের তরফেও অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াকর্ম সারার জন্য খানিকটা সময় থাকে।

বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মৃত্যুদন্ড-বহাল দেশে মৃত্যুদন্ডের রায় আসে নিম্ন আদালত থেকে। মৃত্যুদন্ডের রায় হওয়ার পর থেকে আসামীকে কনডেম সেলে রাখা হয়। তবে উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন সময়ে আবার কনডেম সেল থেকে বের করা হয়।
নিম্ন আদালতের রায়ের পর আসামী উচ্চতর আদালত তথা হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। বাংলাদেশ (এবং সম্ভবত ভারত পাকিস্তান ইত্যাদি) দেশের আইনে আসামী আপিল না করলেও মৃত্যুদন্ডাদেশ হাইকোর্টে অনুমোদনের জন্য যায় ডেথ রেফারেন্স কেস হিসেবে।

হাইকোর্টে মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা মানে কেস সমাপনীর দিকে এগুল। তবে আসামী সবকিছুই জানছেন, তাঁকে আদালতে শুনানিতে যেতে হচ্ছে, তাঁর উকিল তাঁর সাথে নিয়মিত দেখা করছেন ইত্যাদি। হাইকোর্টের রায়ের পর একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসামী সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন।

সুপ্রীম কোর্টও মৃত্যুদন্ড বহাল রাখলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসামী রিভিউ পিটিশন দিতে পারেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন, অথবা পর্যায়ক্রমে উভয়টিই করতে পারেন।

আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রাণদন্ড বা অন্য যে কোনও দন্ড মওকুফ করতে পারেন।সাংবিধানিকভাবে প্রাণভিক্ষা দেওয়ার অধিকার একমাত্র রাষ্ট্রপতির।বাংলাদেশে অনেক আলোচিত অপরাধী প্রাণভিক্ষা বা দন্ড মওকুফী পেয়েছেন। প্রাণভিক্ষার আবেদন গৃহীত না হলে তাও সাথে সাথে আসামীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।

তখনই আসামী জানতে পারেন খুব শীঘ্রই তাঁর জীবন অবসান হতে চলেছে। কিন্ত এক্জ্যাক্ট দিন-তারিখ দিন দুই আগে জানানো হয়। আর সেই দিন বা তার আগের দিন কোনও এক সময় পরিবারের সদস্যদের সাথে শেষ দেখা করানো হয়। ইচ্ছা অনুযায়ী শেষ খাবার দেওয়া হয়।

তবে সাধারণ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এক কক্ষে অনেকে থাকেন, কক্ষের বাইরে ঘোরাফেরার সময়ও বেশি পান। তাঁদের খাবারের জন্য ডাইনিংয়ে যাওয়া, গোসলের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রে সাধারণ বন্দীরা বেশি ছাড় পান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *