আর্মেনিয়া-আজারবাইজান যুদ্ধ-পৃথিবীর মোড়লদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির দেখানোর স্থান

যুদ্ধটা হচ্ছে ন্যাগরনি কারাবাখ নিয়ে। আর্মেনিয়া ১৯৯২-৯৪ সালে যখন এই নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করে নেয় তখন সেখান থেকে প্রায় দশ লাখ আজেরি উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছিল। এর পর থেকে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দুটো দেশের মধ্যে গত কয়েক দশকে বারবার কূটনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, হুমকি দেওয়া হয় একে অপরকে আক্রমণের।এই যুদ্ধে বেসামরিক লোকজনও প্রাণ হারাচ্ছেন।

ব্রাসেলস-ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বা আইসিজি বলছে, ২০১১ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ শান্তি আলোচনা থেমে যাওয়ার পর দুটো দেশের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি একে অপরকে আক্রমণ করার হুমকিও বেড়েছে।

আইসিজি বলছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সামরিক বিষয়ে কোন ভুল হলে তার পরিণতি স্থানীয় বিরোধকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে কারণ এই অঞ্চলের সাথে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর স্বার্থ জড়িত।

“দক্ষিণ ককেশাসে বড় বড় দেশগুলো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। জ্বালানির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ফলে নাগোর্নো-কারাবাখের বাইরেও আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সীমান্তে সংঘর্ষ হচ্ছে,” বলেছে আইসিজি।

একটু আগে শুনলাম আর্মেনিয়া যুদ্ধবিরতিতে যেতে চাইছে, তারও আগে শুনলাম আর্মেনিয়া আজারবাইজানে পারমাণবিক হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছে, তারও আগে আর্মেনিয়া অনেক দাবি জাহির করেছে। অর্থাৎ বেশি বকবকানি শুনা যাচ্ছে আর্মেনিয়ান সামরিক কর্মকর্তাদের থেকে। পত্রপত্রিকা বেশ কয়েকদিন পড়েছি, আর্মেনিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এই একবার প্রতিরোধের কথা বলেন তো আরেকবার তুরষ্ককে দোষারোপ দেন।

তবে যাইহোক, আর্মেনিয়ার পারমাণবিক হামলা চালানোর হুমকি আবার এই যুদ্ধবিরতির আহবান থেকে বুঝা যায় পরিস্থিতি আর্মেনিয়ার পক্ষে নেই। কনভেনশনাল যুদ্ধে হেরেই গেলেই কেবল কেউ পারমানবিক হামলার কথা বলতে পারে, আর এসব নিছক বাচ্চামি, পারমানবিক অস্ত্র শক্তিধর দেশ না হয়েও আর্মেনিয়া এরকম কথা বলেছে কারণ তাদের সাথে রাশিয়া আছে।

তো কাহিনী হচ্ছে কারাবাখ এলাকাটা আসলে আজারবাইজানেরই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেংগে যে এই রাষ্ট্রগুলো হয়েছিল তাদের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল একটা বিশেষ পার্টির মাধ্যমে, মুলত সোজা কথায় ওই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টিই এই ভাগ বাটোয়াড়া আগে থেকে করে রেখেছিল। কারাবাখ অঞ্চলটা আসলে খ্রীস্টান অধ্যুষিত তাই স্বাভাবিকভাবেই আর্মেনিয়ার সাথে একটা মহব্বত থাকবে। নব্বই দশকে যে যুদ্ধের মাধ্যমে এই কারাবাখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে চলে গিয়েছিল তাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাশিয়ার মদদ ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্যগঠিত রাশিয়ায় অর্থোডক্স খ্রীস্টান চার্জগুলো পুনরায় তাদের প্রভাব গড়তে থাকে। বর্তমান রাশিয়া নিজেকে অর্থোডক্স খ্রীস্টান মতবাদের রক্ষকর্তা হিসেবে মনে করে তাই বিশ্বব্যাপী অর্থোডক্সদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকে। আর্মেনিয়া যেহেতু অর্থোডক্স ও কারাবাখও ঠিক তাই, রাশিয়া যেহেতু বৈধভাবে একে আর আর্মেনিয়ার অংশ করতে পারবে না তাই পরিকল্পিতভাবে এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে তুলে দেয়।

বর্তমান চলা যুদ্ধে আর্মেনিয়ানদের পাশাপাশি ওখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও লড়ছে আজারবাইজানীদের বিপক্ষে।তাছাড়া এটি একই সাথে রাশিয়ার জন্য প্রভাব খাটানোর একটা অজুহাত হিসেবে কাজ করে। আর্মেনিয়ায় কিন্তু রাশিয়ার ঘাটি আছে যেটা অনেকে জানেন না। এই বাল্টিক অঞ্চলটা বিশ্বরাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যেখানে আর্মেনিয়াই রাশিয়ার একমাত্র সম্বল। আর্মেনিয়ার শক্তিশালী লবিস্ট আছে ইউএসএতে, রাশিয়ায় ও ফ্রান্সে। একারণেই ফ্রান্সকেও আমরা সরব দেখতে পাচ্ছি এ ব্যাপারে। রাশিয়ায় অনেক ধনকুবেরও আর্মেনিয়ান। অর্থাৎ একে বলা যায় খ্রীস্টানদের ইসরায়েল ।

রাশিয়া কখনও চাইবেনা এই সমস্যার সমাধান করতে কারণ তাহলে সার্বিয়ার মতো আর্মেনিয়াও হাতছাড়া হবে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন তুরষ্ককে চাপে রাখতে রাশিয়াই আর্মেনিয়াকে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। এতে করে তুরষ্ক তা ঠেকাতে আসবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে রাশিয়া ও তুরষ্কের যে প্রতিযোগিতা চলে সেখানে তুরষ্কের মনযোগে ভাটা পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, লিবিয়া ও সিরিয়ায় একাধিক ইস্যুতে রাশিয়া ও তুরষ্ক পরষ্পর বিরোধী অবস্থানে আছে।

মজার ব্যাপার হলো বাংলাদেশেও আর্মেনিয়ার ভালো লবিং আছে। ঢাকার আর্মেনিটোলা কিন্তু এই আর্মেনিয়ার নামের সাথে জড়িত। আগে অনেক আর্মেনিয়ান অধিবাসী ছিল ঢাকায়।

যদি বলেন ৯৭℅ খ্রীস্টান ও ঐতিহাসিকভাবে কারাবাখ আর্মেনিয়ার অংশ হওয়া উচিত তাহলে এই দাবি একেবারে যুক্তিহীনও নয়। কিন্তু তাহলে সেই যুক্তিতে কাশ্মীর পাকিস্তানকে দিয়ে দিতে হবে, আরাকান রোহিংগাদের দিয়ে দিতে হবে, সমগ্র ফিলিস্তিনকে ফিলিস্তিনিদের করে দিতে হবে, চেচানকে রাশিয়া থেকে আলাদা করে দিতে হবে….

বিশ্বনেতাদের ইসলাম নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? এঞ্জেলা মারক্যালের পর এবার একই স্বরে ইমান্যুয়েল ম্যাক্রঁন বললেন ইসলাম নাকি ঝুকিতে আছে! অথচ ঝুকিতে তো অনারা নিজেরাই ফেলেছেন৷ বোরখা, মুখঢাকা নিষিদ্ধ করেছিলেন কিন্তু এখন কভিডের কারণে নিজেরাই মুখ ঢাকতে বাধ্য হচ্ছেন।