ভার্সাই চুক্তি – শান্তির পরশ নাকি অশান্তির পুর্ভাবাস?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যা ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই ইউরোপে শুরু হয় এবং ১১ নভেম্বর ১৯১৮ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই যুদ্ধে ৯০ লক্ষ যোদ্ধা ও ১ কোটি ২০ লক্ষ নিরীহ মানুষ নিহত হয়। প্রায় এককোটি সৈন্য এবং ২ কোটি ১০ লক্ষ সাধারণ মানুষ আহত হয়।
রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের অবসান ঘটে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে। যেটা সম্পন্ন হয়েছিল ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে। কিন্তু এই চুক্তি তখনকার সময়ে শান্তির বার্তা ছড়ালেও পরবর্তীতে কি মানব ইতিহাসে শান্তির বার্তা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

ভার্সাই চুক্তি

ভার্সেই চুক্তি

ভার্সেই চুক্তি

১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে জার্মান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাস্ট্রপতি উড্রো উইলসনকে যুদ্ধবিরতির আহবান জানান৷ এই উপলক্ষে উড্রো উইলসন ১৪ দফার শান্তি চুক্তি পেশ করেন। কিন্তু কিছু গোপন চুক্তির কারনে এই চুক্তি কার্যকর হয়নি।
১৯১৯ সালের বসন্তে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারিস শান্তি সম্মেলনে চুক্তির খসড়া করা হয়। খসড়ার মূল নকশা করেন চারজন নেতা যারা ইতিহাসে বিগ ফোর হিসেবে খ্যাত। এরা হলেন বৃটেনের ডেভিড লয়েড জর্জ, ফ্রান্সের জর্জেস ক্ল্যামেনকু, যুক্তরাষ্ট্রের উড্রো উইলসন এবং ইতালিরভিটোরিও অরল্যান্ডো। মূলত প্রথম তিনজনই নকশা তৈরি করেন।
দ্যা বিগ ফোর

দ্যা বিগ ফোর

কিন্তু মজার ব্যাপার হল পরাজিত শক্তি, বিশেষ করে জার্মানীর সাথে চুক্তির বিষয়ে কোন কথা বলা হয় নি, তাদের সুযোগও দেওয়া হয়নি৷ এমনকি মিত্রশক্তির সহযোগী জাতি গুলোরও কোন উল্লেখযোগ্য ভুমিকা এখানে ছিল না।
১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি এক বসন্তে প্যারিসে শুরু হয়ে গেল শান্তি আলোচনা। ঐতিহাসিক এই সম্মেলনে যোগদান করেন ৩২টি মিত্রদেশের কুটনৈতিকরা। প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ২০০ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র তৈরি হয়। চুক্তিপত্র তৈরি করার পর জার্মানীকে আমন্ত্রন জানানো হয়৷ কিন্তু এই চুক্তিপত্র ছিল জার্মানীর জন্য চরম অবমাননাকর। এই শান্তি চুক্তি ছিল এক পাক্ষিক, মিত্রশক্তির তরফ থেকে অক্ষশক্তির প্রতি চুড়ান্ত আক্রমন।
প্যারিস থেকে ২২ কিলোমিটার দুরে ১৬৬০ সালে নির্মিত ভার্সাই রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানো হয় জার্মানীর প্রতিনিধিদের। ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই রাজপ্রসাদের মিরর হলে মুখোমুখি বসেছেন জার্মানি এবং মিত্র পক্ষের ৩২টি দেশের নেতৃবৃন্দ। মিত্রবাহিনী কর্তৃক গৃহীত চুক্তিপত্র পড়ে শুনিয়ে দেওয়া হলো জার্মান প্রতিনিধি দলকে। হল রুমে বসেই জার্মান প্রতিনিধি দল সন্ধির শর্তগুলো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কারণ চুক্তিগুলো ছিল একপাক্ষিক।
চুক্তিতে প্রধান যে শর্তাবলী গুলো ছিলঃ
  •  লিগ অফ নেশনসের সৃষ্টি
  • পরাজিত দেশগুলোর সাথে পাঁচটি শান্তিচুক্তির পাশাপাশি জার্মানির সাথে ভার্সাই চুক্তি।
  • জার্মানি এবং অটোমানদের বিদেশে দখলকৃত অংশগুলো পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দেয়ার আদেশনামা, মূলত ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে দিয়ে দিতে হবে।
  • জার্মানির উপর ক্ষতিপূরণের দায় চাপিয়ে দেওয়া জাতিগত সীমানা নির্ধারণে নতুন জাতীয় সীমারেখা প্রণয়ন।
জার্মানি সংক্রান্ত শর্তাবলীঃ
২৩১: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য জার্মানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করা হয়। যার মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যার কিছু অংশ পূরণ করতে গিয়েও জার্মানি দেউলিয়া হয় যায়।
১৫৯-১৬৩: ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির সামরিক শক্তি কমিয়ে আনতে বলা হয়, সৈন্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ লক্ষ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আর এসকল সৈন্য শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিয়োজিত থাকবে। নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ১৫ হাজার। যেসকল যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে তা মিত্রবাহিনীর হাতে সমর্পণ করবে। জার্মানির কোনো বিমানবাহিনী থাকতে পারবে না।
২২৭-২৩১: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য জার্মানিকে দায়ী করা হয় এবং জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়।
৫১: আলসেস-লাউরেইন অঞ্চলটি জার্মানি ফ্রান্সের থেকে দখল করে নেয় ১৮৭১ সালে। সেটা ফ্রান্সকে ফেরত দিতে হবে।
৮০: জার্মানি থেকে আলাদা করে অস্ট্রিয়াকে স্বাধীনতা দিতে হবে।
১১৯: বিভিন্ন মহাদেশে জার্মানির কলোনিগুলো মিত্রপক্ষ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। এসকল কলোনি আর কখনো জার্মান সাম্রাজ্যভুক্ত হতে পারবে না। ব্রিটেন, ফ্রান্স নিজেদের মধ্যে ক্যামেরুন ও টোগোকে ভাগ করে নেবে। জার্মান নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক এলাকা দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হস্তান্তর করে দিতে হবে।
৪২-৪৪: এ সকল শর্ত কার্যকর করার নিশ্চিত করতে রাইন নদীর পশ্চিম তীরবর্তী জার্মান ভূখণ্ডে মিত্রশক্তি ও তাদের সহযোগী সেনাবাহিনীর দখলে থাকবে ১৫ বছর।
১৬৪: জার্মানি অন্য কোনো দেশ থেকে সমরাস্ত্র আমদানি রপ্তানি করতে পারবে না। সাবমেরিন, ভারী কামান, ট্যাংক ও বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করতে পারবে না এবং নিজ দখলে রাখতে পারবে না।
৮৭: ক্ষতিপূরণস্বরূপ উত্তর শ্লেসভিগ (Northern Schleswig) ডেনমার্কের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। প্রুশিয়ান এলাকাগুলো হস্তান্তর করতে হবে পোল্যান্ডের কাছে।
ভার্সেই চুক্তি সম্পাদন, মিরর হল, ভার্সেই রাজপ্রাসাদ প্যারিস

ভার্সেই চুক্তি সম্পাদন, মিরর হল, ভার্সেই রাজপ্রাসাদ প্যারিস

এই চুক্তি জার্মানদের জন্য ছিল চুড়ান্ত পরাজয়ের। তারা এটাকে “dictated peace” বা বিজিতার উপর বিজেতার চাপিয়ে দেওয়া শান্তি চুক্তি হিসেবে ঘোষনা দেন।। কিন্তু এই চুক্তি মেনে না নেওয়া ছাড়া তাদের হাতে কোন উপায় ছিল না।রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত করার জন্য শান্তি চুক্তির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একপাক্ষিক ভাবেই, অনেকটা জোর খাটিয়ে এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়। ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারী এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু চুক্তির শর্তাবলী জাতিগতভাবে জার্মানী মেনে নিতে পারেনি। যার কারনেই উৎপত্তি হয় নাৎসি বিপ্লবী বাহিনীর এবং উত্থান হয় হিটলারের। যা আরো বেশি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঢেলে দেয় বিশ্ব এবং মানবজাতিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *