ঐতিহাসিক চিঠি যা ভারতের ইতিহাসকে বদলে দেয়

৭১১ সাল। শ্রীলংকার বন্দর থেকে কিছু আরব পরিবারকে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্রাট ওলিদের পক্ষ থেকে জাহাজ পাঠানো হয়। সেই জাহাজে সিংহলের রাজার জন্য বেশ কিছু আরবী ঘোড়া পাঠানো হয়েছিল। সিংহলের রাজা আরবদের উত্থানের গল্প শুনে এমনিতেই বিস্ময়ে অভিভুত তার উপরে আরব ঘোড়া পেয়ে আরো অনেক খুশী হলো। তিনিও খলিফাকে দেয়ার জন্য বেশ কিছু উপহার সামগ্রী আরবদেরকে দিলেন। এছাড়া সিংহলে উৎপাদিত মশলার একটা বাজার আরবে সৃষ্টি করতে চাইলেন। কারন তিনি জানেন আরবের বাজারে ভারতীয় উপমহাদেশের মশলার প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

তখন ইঞ্জিনের নৌকা ছিল না। পানি, খাবার নেয়ার জন্য বিভিন্ন বন্দরে নামতে হতো। এরকমই একটা বন্দর ছিল দেবল বন্দর যা পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে অবস্থিত। এই বন্দরে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে জাহাজ লুট করা হতো।সিংহল থেকে ছেড়ে আসা আরবের জাহাজ দেবল বন্দরে নোঙর করতেই জাহাজে ডাকাতদল হামলা করল। জাহাজে অনেক মহিলা ছিল। এছাড়া তারা যুদ্ধ করার জন্য আসে নাই। ফলশ্রুতিতে ডাকাত দল সহজেই জাহাজ লুটপাট করল। ডাকাতদলের আচরণ সম্মন্ধে সবাই জানে। তাই বেশিরভাগ মহিলা জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে তীরে উঠার চেস্টা করল। কেউ বাঁচল, কেউ ডুবে মরল, কেউ তীরে ডাকাতদলের হাতে বন্দী হলো।

জাহাজ লুটপাট প্রাচীন যুগে.jpg
শিল্পীর কল্পনায় প্রাচীন যুগে জাহাজ লুটপাট,Image Credit: Citionhall.ru

সিংহলে বড় হওয়া আরব মেয়ে পালাতে পেরেছিল। তার স্বামী ডাকাতদলের হাতে বন্দী হয়েছিল। মেয়েটা স্বামীর সন্ধানে দেবলের রাজধানীতে গিয়ে খোজ করে জানতে পারল আর স্বামী রাজা দাহিরের কারাগারে বন্দী। রাজা দাহিরের কাছে গেলে তার ইজ্জত থাকবে না। অগত্যা সে বনে আশ্রয় নিলে।

জাহাজ থেকে বেশ কিছু পুরুষও পালিয়েছিল। তাদের সাথে মেয়েটা দেখা করল। আরবদের নতুন রাজাকে সে চিনে না। মেয়েটা নতুন মুসলমান হয়েছে। সামান্য একটা মেয়ের জন্য আরবের রাজা কি কোন ব্যবস্থা নিবেন? ডুবে গেলে মানুষ খড় কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। মেয়েটি তার রক্ত দিয়ে মুসলমানদের শাষণকর্তা খলিফা ওলিদের ডান হাত বসরার গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে একটা চিঠি লিখল।এটা সেই চিঠি যার কারণে গোটা উপমহাদেশের ইতিহাস বদলে গেল।

বসরা, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কার্যালয়।হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দুইটা চরিত্র ছিল,

১- এই সেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যার অত্যাচারে মুসলিমরাও তটস্থ থাকত। কিছুদিন আগে মক্কা আক্রমন করে বয়োবৃদ্ধ সাহাবা সহ অনেককে হত্যা করেছে।

২-তিনি এক সাথে পশ্চিমে মরক্কো, স্পেন, আফ্রিকা, উত্তরে রাশিয়ার সীমান্তে একই সাথে ৩ টি ফ্রন্টে যুদ্ধ করে নিজ দেশের সীমানা বাড়াচ্ছিলেন।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তখন যুদ্ধের মানচিত্র দেখছিলেন। উত্তরের সম্মুখ ফ্রন্টের সবচেয়ে দক্ষ এক জেনারেল আজ আসার কথা। রাশিয়ার একটা দুর্গ তারা কোন ভাবেই দখল করতে পারছিল না।প্রহরী এসে বলল “বোখারা থেকে এক জেনারেল এসেছে। আপনি নাকি তাকে ডেকেছেন?”হাজাজ বিন ইউসুফ তাকে আসতে বললেন।

হাজ্জার বিন ইউসুফের সামনে একটি বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার দাঁড়ি গোফ এখনো ঠিকমত গজায় নি। বয়স খুব বেশি হলে ১৬ কি ১৭ বছর হবে।হাজ্জাজ তাকে দেখে মেজাজ গরম করে বললেন “তোমার জেনারেল কই হে ছোকরা? আর তোমার জেনারেল কি জানে না আমি জেনারেল ছাড়া কারো সাথে এই বিষয়ে কথা বলব না?”

“আমিই সেই জেনারেল!” ছেলেটা বলল।হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ভাবলেন ছেলেটা মশকরা করছে “তুমি কি জানো আমার সাথে তামাশা করার পরিনাম কী?”

“আমি ভালো করেই জানি। কিছুদিন আগে মক্কার লোকজন দেখেছে।’ ছেলেটার কন্ঠে এবার ক্ষোভ।হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবার থমকে গেলেন। ছেলেটা জেনারেল না হয়ে পারে না। কিন্তু এই বয়সে জেনারেল! কিভাবে কী?”তোমার বাড়ী কই?”
তায়েফ” উত্তরটা শুনে হাজ্জা বিন ইউসুফের বুকের ভেতরে ঝড় বয়ে গেল।”তুমি কার ছেলে?” হাজাজ বিন ইউসুফ জিজ্ঞেস করলেন।”ইবনে ইউসুফ আমার বাবার নাম”হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না “তুমি কি আমাকে চিনো?” ভাইয়ের ছেলেকে তিনি চিনতে পারলেন।

“আপনি যুবায়ের (রাঃ) এর হত্যাকারী!” ভাতিজার কাছ থেকে তিনি এই উত্তর আশা করছিলেন কারন তিনি তার ভাইকে ভালো করেই চিনেন।
“আর?”
“আপনি একজন অত্যাচারী শাষক”
“আর?”
“আপনার হাতে মুসলমানদের রক্ত লেগে আছে!”
“আমি যে তোমার চাচা হই সেটা কেউ তোমাকে কেউ বলে নি?”
‘আপনাকে চাচা ডাকতে আমার ঘৃণা হয়! আমার মা বসরায় থাকেন। তিনি আমাকে আপনার সম্মন্ধে সবই বলেছেন।”
“কী? ভাবি বসরায় থাকেন? আর আমার সাথে দেখা করলেন না?”
হাজ্জা বিন ইউসুফ কথা বাড়াতে চাইলেন এমন সময় প্রহরী এসে হাজির হয়ে বললেন “এক আরব আপনার সাথে দেখা করতে চাইছেন। তিনি সিন্ধু থেকে এসেছেন বলে দাবী করছেন।”
সিন্ধু থেকে এসেছে মানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কারণ কিছুদিন আগে কান্দাহারের বিদ্রোহীরা সিন্ধু রাজার সাথে হাত মিলিয়েছে “ডাকো তাকে”
ক্লান্ত বিধ্বস্ত এক লোক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দরবারের প্রবেশ করলেন। কামরায় আছেন শুধুমাত্র তার ভাতিজা মোহাম্মদ বিন ইউসুফ।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে সিংহলের সেই মেয়ের রক্তে লেখা চিঠি দেয়া হলো। চিঠি পড়তে পড়তে ওনার কঠিন হৃদয় গলে গেল। চিঠিতে রাজা দাহিরের কারাগারে আরব বন্দীদের অসহায়ত্বের কথা বলা হয়েছে। শেষ লাইনে লেখা আছে

“দূতের মুখে মুসলমান শিশু ও নারীদের বিপদের কথা শুনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বসরার শাসনকর্তা স্বীয় সৈন্য বাহিনীর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সৈনিককে অশ্ব প্রস্তুত করার আদেশ দিয়েছেন। সংবাদ বাহককে আমার এ পত্র দেখাবার প্রয়োজন হবে না। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের রক্ত যদি শীতল হয়ে জমে গিয়ে থাকে তবে হয়ত আমার এ পত্রও বিফল হবে। আমি আবুল হাসানের কন্যা। আমি ও আমার ভাই এখনো শত্রুর নাগালের বাইরে। কিন্তু আমার অন্য সকল সঙ্গী শত্রু হাতে বন্দী – যার বিন্দু মাত্র দয়া নাই। বন্দীশালার সেই অন্ধকার কুঠুরির কথা কল্পনা করুন – যেখানে বন্দীরা মুসলিম মুজাহিদদের অশ্বের ক্ষুরের শব্দ শুনার জন্য উৎকর্ণ ও অস্থির হয়ে আছে। আমাদের জন্য অহরহ সন্ধান চলছে।

সম্ভবতঃ অচিরেই আমাদেরকেও কোন অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দী করা হবে।এও সম্ভব যে, তার পূর্বেই আবার যখন আমাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দেয়া হবে এবং আমি সেই দুরদৃষ্ট হতে বেঁচে যাব। কিন্তু মরবার সময় আমার দুঃখ থেকে যাবে যে, যেসব ঝাঞ্চাগতি অশ্ব তুর্কিস্তান ও আফ্রিকার দরজা ঘা মেরেছে, স্বজাতির এতীম ও অসহায় শিশুদের সাহায্যের জন্য তারা পৌছাতে পারল না। এও কি সম্ভব যে তলোয়ার রোম ও পারস্যের গর্বিত নরপতিদের মস্তকে বজ্ররূপে আপতিত হয়েছিল, সিন্ধুর উদ্ধত রাজার সামনে তা ভোঁতা প্রমাণিত হল। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। কিন্তু হাজ্জাজ, তুমি যদি বেঁচে থাক, তবে আমার আত্মমর্যাদাশীল জাতির এতীম ও বিধবাদের সাহায্যে ছুটে এস।”আত্মমর্যাদাশীল জাতির এক অসহায় কন্যা।এই চিঠিই ভারতের ইতিহাস বদলে দেয়।